শিরোনাম

শনিবার, ফেব্রুয়ারী 24, 2018 - কুমিল্লায় আনুষ্ঠানিকভাবে ৪জি চালু করলো গ্রামীণফোন | শনিবার, ফেব্রুয়ারী 24, 2018 - ট্রাভেল বুকিং এ যুক্ত হলেন সাকিব আল হাসান | শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী 23, 2018 - অনলাইন পোর্টালের গুঞ্জনে ক্ষুব্ধ তাসকিন | বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী 22, 2018 - দর্শনার্থী নেই বেসিস সফটএক্সপোতে ! | বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী 22, 2018 - বিসিএস নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ | বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী 22, 2018 - ২০১৭ সালে রবি’র লোকসান ২৮০ কোটি টাকা | বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী 22, 2018 - বাংলাদেশের গ্রাহকদের জন্য অপো স্মার্টফোনসমূহ ৪জি সেবা দিতে প্রস্তুত | বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী 22, 2018 - বিইউপিবিজিএ-এর বার্ষিক বনভোজন সম্পন্ন | বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী 22, 2018 - উদ্বোধন হলো বেসিস সফটএক্সপো ২০১৮’র | বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী 22, 2018 - এলো টোটেলিংক এর হাই স্পীড ওয়াইফাই রাউটার |
প্রথম পাতা / অর্থনীতি / আধুনিক প্রেক্ষাপট ও ইসলামী ব্যাংকিং
আধুনিক প্রেক্ষাপট ও ইসলামী ব্যাংকিং

আধুনিক প্রেক্ষাপট ও ইসলামী ব্যাংকিং

আধুনিক অর্থনীতিবিদরা ব্যাংক এর মূল পরিচিতি দেয়ার পূর্বে এভাবেই এর প্রয়োজনীয়তার দিকটি তুলে ধরেছেন। সাধারণ অর্থে যে প্রতিষ্ঠান সাধারণ জনগনের অর্থ গচ্ছিত রাখে আবার এই গচ্ছিত অর্থ থেকে ঋণ প্রদান করে তাকে ব্যাংক বলে।

images (7)
বর্তমানে আধুনিক সভ্যতা যেমনি একদিনে গড়ে ওঠেনি, তেমনি আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থাও একদিনের ফসল নয়। কালের স্রোতে, মানুষের নানাবিধ প্রয়োজনে, ব্যবসা-বানিজ্যর ব্যাপকতার ফলে অর্থ নিরাপদে রাখার প্রয়োজনীয়তার সাপেক্ষে ব্যাংক ব্যবসায়ের উৎপত্তি ঘটে। প্রাচীন কালে মানুষ তার উদ্বৃত্ত অর্থ নিরাপত্তার তাগিদে নানা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয় গুলোতে জমা রাখত। তখনকার ধর্মীয় উপাসানালয়ের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় নেতাদের সততা, নিষ্ঠার প্রতি বিশ্বাসের ফলে মানুষ এদের কাছে টাকা জমা রাখা এবং প্রয়োজনে আবার ফেরত নেয়া উপযুক্ত মনে করত। পরবর্তীতে নিরাপত্তার শিথিলতা, কাজের ব্যাপকতা, জমাকৃত টাকা থেকে কিছু বাড়তি সুবিধার প্রত্যাশায় জনসাধারণ তাদের উদ্বৃত্ত টাকা পয়সা ও স্বর্ণালংকার স্বর্ণকার, মহাজন এবং ব্যবসায়ীদের কাছে জমা রাখত। তখনকার এই তিন শ্রেণীর লোকেরা টাকা গচ্ছিত রেখে, একটি রশিদ প্রদান করত। এছাড়াও জমাকৃত অর্থের অতিরিক্ত কিছু বাড়তি অর্থও দিত। পরবর্তীতে যা সুদ বলে পরিগনিত হয়্ স্বল্প সুদে টাকা জমা রাখা ও জমাকৃত অর্থ চড়া সুদে অন্যকে ঋণ দেয়া যখন একটি ব্যবসা হিসেবে বিবেচিত হলো, তখন থেকেই এই ব্যাংক ব্যবস্থা ব্যক্তি পর্যায় থেকে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে রূপান্তরিত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় ব্যাংক ব্যবস্থা এক মালিকানা ভিত্তিক থাকলেও পরবর্তীতে তা যৌথ মুলধনী কারবারে পরিগ্রহ করে। এরপর রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সরকার গুলো যখন দেখতে পেলো যে, অর্থের মাধ্যমেই ব্যবসায়ীরা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রন করছে,সরকারগুলো এই অর্থ ব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার মানসে নোট ও মুদ্রার প্রচলন ঘটায় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সৃষ্টির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা সরকারের হাতে নেয়। প্রাথমিক অবস্থায় ব্যাংকের কোনো শ্রেণী বিভাগ না থাকলেও সময়ের ধারাবাহিকতায় কালের বিবর্তনের ধারা থেকে বর্তমানে ব্যাংকের অনেক শ্রেণীভেদ সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ব্যাংক ব্যবস্থায় আরো যে কতো পরিবর্তন হবে তা একমাত্র সময়ই বলতে পারবে। তবে এটা অনস্বীকার্য যে, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড যতই বাড়বে ব্যাংকিং কার্যক্রমের গতিশীলতাও ততই বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমান সভ্যতার ইসলামী ব্যাংকিং মুসলমানদের জীবনের একটি বিরাট সমস্যা থেকেই উদ্ভূত। প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থা মুসলমানদের জন্য তথা সমগ্র মানব জাতির জন্য কোন কল্যাণকারী প্রতিষ্ঠান নয়। বরং মুসলমানদের জন্য এক চরম সমস্যা ও ভাবনার কারণ। এর অন্যতম কারণ হলো সুদ। এ প্রতিষ্ঠানের সেবা গ্রহণ করতে মুসলমানরা বাধ্য হয়ে প্রকারান্তরে আল্লাহ্ নিষিদ্ধ সুদের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে যার পরিণতি হলো ভয়াবহ জাহান্নামের অধিবাসী হওয়ার ঝুঁকি গ্রহণ করা। যার থেকে অধিক সমস্যা বা ভয়াবহতা মুসলমানদের জন্য আর কিছুই হতে পারে না।
তাছাড়া সুদের কুফলের কারণে পার্থিব ক্ষতিতো রয়েছেই। সুতরাং এই সমস্যা হতে উত্তরণের জন্য সুদী ব্যাংকের বিকল্প প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যার দ্বারা মানুষ সুদের ভয়াবহতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে। মুসলমানদের ইসলামী চেতনাবোধ থেকে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাট দশকের দিকে। প্রথম দিকে দু’একটি দেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হলেও এ বিষয়ে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৭০-১৯৭৫ সালের মধ্যে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। মিশরের আল্লামা আহমদ আল-নাগারের রুপরেখার ওপর ভিত্তি করে মিশরে ১৯৬০ সালে সর্ব প্রথম ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। যার নাম সেভিংস ব্যাংক। পরবর্তীতে অল্প সময়ে আরো ৯টি প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। খুব সফলভাবে এগুলো পরিচালিত হয়। ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ হয়। এর পর ১৯৮৭ সালে আল-বারাকা ব্যাংক, ১৯৯৫ সালে আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংক ও সোসাল ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক নামে তিনটি ইসলামী ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। আমরা ইতিমধ্যে শরীয়া সমর্থিত বিভিন্ন প্রকার ক্রয়-বিক্রয়, ইজারা, অংশীদারি ব্যবসার উল্লেখ করেছি যা দ্বারা মানুষ তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম হত। মূলতঃ ইসলামী ব্যাংক একটি নিখাদ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়, স্থায়ী সম্পদ ইজারাদান, ব্যবসায় অংশীদার হওয়া ও অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন প্রকার সেবার বিক্রয়ের মাধ্যমে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সুতরাং দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো সুদী ব্যাংক একটি অর্থ লগ্নিকারী বা আর্থিক ইন্টারমিডিয়ারী প্রতিষ্ঠান; অপরদিকে ইসলামী ব্যাংক একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সুদী ব্যাংকসমূহ অর্থ লগ্নি হতে প্রাপ্ত সুদ হতে ডিপোজিটরদেরকে একটি নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করার পর যা অবশিষ্ট থাকে তা নিজেদের আয় হিসেবে গ্রহণ করে। তারা অর্থ সংগ্রহের জন্য যে সুদ প্রদান করে তার সাথে অন্যান্য খরচ যোগ করে তহবিল খরচ (ঈড়ংঃ ড়ভ ভঁহফ) হিসাব করে তার সাথে আরও কিছু যোগ করে লগ্নির উপর চার্জতব্য সুদ হিসাব করে। অপরদিকে ইসলামী ব্যাংকের তহবিল খরচ বা ঈড়ংঃ ড়ভ ভঁহফ বলতে কিছু নেই। তারা পণ্য ক্রয় করে তার উপর যৌক্তিক মুনাফা যোগ করে বিক্রয় করে, স্থায়ী সম্পদ ক্রয় করে তা ভাড়ায় খাটিয়ে, বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বছর শেষে যে মুনাফা প্রাপ্ত হয় তা উদ্যোক্তা (শেয়ার ধারক), অংশীদার, মুদারিব, সাহিব আল মাল (অর্থ বিনিয়োগকারী) দের মধ্যে মুনাফা হিসেবে বণ্টন করে দেয়।
ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম
প্রচলিত (ঈড়হাবহঃরড়হধষ) ব্যাংকসমূহের কার্যক্রম হতে মানুষ যে সুবিধা পেয়ে থাকে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম হতে প্রাপ্ত সুবিধাও তার অনুরূপ। তথাপিও দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। মনে রাখতে হবে কার্যক্রমের এ পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণেই একটি ব্যাংক ইসলামী তথা হালাল এবং অপর ব্যাংকটি অনৈসলামিক তথা হারাম। যে ব্যাংকের ভিত্তিই হলো সুদ সে ব্যাংকের লেনদেন কোনভাবেই, কখনোই হালাল হতে পারে না। তেমনি একটি ব্যাংক ইসলামী শরীয়া মোতাবেক পরিচালিত হওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং শরীয়া বোর্ড থাকা সত্ত্বেও লেনদেনের ক্ষেত্রে যদি ইসলামী পদ্ধতিসমূহের পরিপূর্ণ প্রয়োগ করা না হয় তবে সুদের আবির্ভাব ঘটতে পারে। ফলে হালাল উপার্জনের সাথে হারাম উপার্জনও মিশ্রিত হতে পারে। আর তাই ইসলামী ব্যাংকসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি উদ্যোক্তা কর্মকর্তা, কর্মচারী, বিনিয়োগ গ্রহীতাকে এ সকল পদ্ধতিসমূহ খুব ভাল করে বুঝা এবং তার যথাযথ অনুসরণ অত্যাবশ্যক। ইসলামী ব্যাংকসমূহ কর্তৃক অনুসৃতব্য কর্মপন্থাসমূহ হলো –

আল ওয়াদিয়াহ্ হিসাব
আরবী ওয়াদিয়াহ্ শব্দের অর্থ হলো আমানত। হুবহু কোন বস্তু চাওয়া মাত্র ফেরৎ পাওয়ার শর্তে কারো নিকট গচ্ছিত রাখাকে আমানত বলে। স্বাভাবিক অবস্থায় আমানত গ্রহণকারী উক্ত বস্তুটি নিজের জন্য ব্যবহার না করে আমানত প্রদানকারীকে চাওয়ামাত্র প্রদান করার লক্ষ্যে শরীয়া সম্মতভাবে সংরক্ষণ করবে। অর্থাৎ নিজের মাল হিফাযতের ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে অনুরূপ ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রেও গ্রহণ করবে। সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শরীয়া সম্মত পদ্ধতি সতর্কতার সাথে পরিপালন করার পরও যদি উক্ত বস্তু হালাক হয়ে যায়, তাহলে আমানত গ্রহণকারী তার দায়ভার গ্রহণ করবে না, তবে এইরূপ আমানতের ক্ষেত্রে আমানত গ্রহীতা উক্ত বস্তুটি হতে নিজে উপকারিতা লাভ করতে পারে না কিন্তু এর জন্য যুক্তি সঙ্গত কোন খরচ হলে তা গ্রহণ করার অধিকার লাভ করে। আমানত গ্রহীতা যদি বস্তুটি ব্যবহার করে উহা হতে উপকারিতা লাভের শর্তে গ্রহণ করে তবে তাকে শরীয়ার দিক থেকে বলা হবে আরিয়া। আরিয়া অর্থ বিনিময় গ্রহণ ছাড়া উপকার লাভের জন্য মালিক বানানো। ইসলামী ব্যাংকসমূহ আল-ওয়াদিয়া হিসাবের মাধ্যমে এই পদ্ধতিতে অর্থ জমা গ্রহণ করে যাতে তা ব্যবহারের মাধ্যমে তা থেকে উপকারিতা লাভ করা যায়।
মুদারাবা হিসাব
ইসলামী ব্যাংকসমূহ মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাবের মাধ্যমে অলস অর্থের মালিকদের অর্থ গ্রহণ করে তা বৈধ ব্যবসায় খাটিয়ে যে মুনাফা পায় তার আংশিক মালের মালিকদের মধ্যে বণ্টন করে থাকে। মুদারাবা শব্দটি দারাবা ধাতু থেকে এসেছে যার আভিধানিক অর্থ বিভিন্ন স্থানে গমনাগমন। যেহেতু মুদারিব তার চেষ্টা ও পরিশ্রমের দ্বারা মুনাফার অধিকারী হয় সেহেতু মুদারাবা চুক্তির এরূপ নামকরন করা হয়েছে। ইসলামী শরীয়া উভয়পক্ষের প্রয়োজনে এরূপ লেনদেন অনুমোদন করেছে। কেননা একদল মানুষ পুঁজিতে স্বচ্ছল কিন্তু পুঁজি পরিচালনায় অনভিজ্ঞ অপরদিকে আরেকদল মানুষ পুঁজি পরিচালনায় অভিজ্ঞ কিন্তু পুঁজিহীন। ফলে এরূপ চুক্তির মাধ্যমে উভয়েই সুবিধা লাভ করতে পারে। মুদারাবা হচ্ছে দুই পক্ষের একপক্ষ থেকে পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে শরীকানার ভিত্তিতে সম্পন্ন চুক্তি। মুদারাবা চুক্তি ঐ মাল ছাড়া সিদ্ধ হবে না যে মালে শরীকানা সিদ্ধ হয়। মুদারাবার আরেকটি শর্ত এই যে, অর্জিত মুনাফা উভয়ের মাঝে পরিব্যাপ্ত হবে। কোন পক্ষই মুনাফা থেকে নির্ধারিত পরিমাণ দিরহামের হকদার হবে না। মুদারাবার ক্ষেত্রে পুঁজি মুদারিবের হাতে অর্পণ করা আবশ্যক। পুঁজিদাতার তাতে কোন হস্তক্ষেপের অধিকার থাকে না।

>>পুঁজিদাতা মুদারাবার জন্য কোন সময় নির্ধারণ করে দিলে উক্ত সময় অতিক্রান্তের পর চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।
>>পূর্ব নির্ধারিত জায়েয শর্ত মোতাবেক পুঁজিদাতা ও মুদারিবের মধ্যে মুনাফা বণ্টন হবে।
>> মুদারিবের পুঁজি প্রত্যার্পণের পর যে মুনাফা অবশিষ্ট থাকবে মুদারিব তার অংশ পাবে। পূর্বে মুনাফা বণ্টিত হলে পুঁজি প্রত্যার্পণকালে যদি দেখা যায় পুঁজিদাতার মূল পুঁজি অপেক্ষা কম পুঁজি রয়েছে তবে মুদারিব ঐ মুনাফা ফেরত দানের মাধ্যমে পুঁজি পূর্ণ করে দিবে। তবে মুনাফার অতিরিক্ত ফেরত দিতে হবে না।
>>পুঁজিদাতা বা মুদারিব মারা গেলে বা পুঁজিদাতা মুরতাদ হয়ে দারুল হারবে চলে গেলে মুদারাবা চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।
>>পুঁজিদাতার পুঁজি মুদারিবের কাছে আমানতস্বরূপ থাকে এবং এই পুঁজির ক্ষেত্রে সে পুঁজি বিনিয়োগকারী ওকীল হয়ে থাকে। কেননা সে পুঁজির মালিকের আদেশক্রমে তাতে পরিচালনা করে থাকে। আর যখন মুনাফা অর্জন করবে তখন সে তাতে পুঁজি বিনিয়োগকারীর শরীকদার হবে। কেননা সে তার শ্রম দ্বারা মালের একাংশের তথা মুনাফার মালিকানা লাভ করেছে।
>>মুদারিব যদি পুঁজিদাতার পুঁজি দ্বারা ক্রয়কৃত কোন পণ্যের সাথে নিজের পণ্য মিশ্রিত করে বা অপর উপাদান সংযোজনের মাধ্যমে গুণগত উৎকর্ষ বৃদ্ধি করে তবে এক্ষেত্রে মুদারিব ঐ পণ্যে পুঁজিদাতার অংশীদার হবে। সংযোজিত অংশের বিক্রয় মূল্য মুদারিব গ্রহণ করবে আর মূল পণ্যের বিক্রয় মূল্য হতে পুঁজির অতিরিক্ত মুনাফা পুঁজিদাতা ও মুদারিবের মধ্যে বণ্টিত হবে।

সুতরাং মুদারাবা এমন একটি পদ্ধতি যে পদ্ধতিতে মুদারিব পুঁজিদাতার পুঁজি ব্যবহার করে কোন নির্দিষ্ট ব্যবসা হতে যে মুনাফা অর্জন করে তা নিজেদের মধ্যে পূর্ব শর্তানুসারে বণ্টন করে নেয়। এই ব্যবসার ক্ষেত্রে পুঁজিদাতাই থাকে পুঁজির মালিক যা মুদারিবের কাছে আমানতস্বরূপ থাকে। আর মুদারিব যখন উক্ত পুঁজি দ্বারা ব্যবসার জন্য কোন পণ্য ক্রয় করে তখন মুদারিব উক্ত পণ্যের বিক্রয় মূল্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত মুনাফার অংশের শরীকদার হয়।
উপরোক্ত নীতিমালার আলোকে ইসলামী ব্যাংকসমূহ কর্তৃক পুঁজিদাতাদের কাছ থেকে গৃহীত পুঁজি পৃথক পৃথকভাবে ব্যবসায় খাটিয়ে উক্ত ব্যবসা হতে অর্জিত মুনাফা ব্যাংক ও পুঁজিদাতার মধ্যে বণ্টিত হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে পুঁজিদাতাদের প্রত্যেকের পুঁজিকে আলাদাভাবে ব্যবসায় খাটিয়ে আলাদাভাবে মুনাফা নির্ণয় এবং বণ্টন সম্ভব নয়। কেননা –

>> ব্যাংকসমূহ বাই মুয়াজ্জাল ও মুরাবাহা পদ্ধতিতে পণ্য বিক্রয় করে থাকে। সাধারণতঃ ক্রেতাকে মূল্য পরিশোধের জন্য দেশীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এক বছর এবং বৈদেশিক পণ্যের ক্ষেত্রে তিন মাস সময় প্রদান করে থাকে। অথচ পুঁজিদাতাগণ এক/দুই মাসের জন্য অর্থ জমা রেখেও মুনাফা আশা করে থাকে।
>>পুঁজিদাতাদের কেউ কেউ পাঁচ হাজার, দশ হাজার বা অনুরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজি জমা রাখে অথচ ব্যাংককে প্রায়ই এ সকল পুঁজিগুলোকে একত্রিত করে লক্ষ কোটির অংকে পণ্য বিক্রয় করতে হয়।
>> নির্দিষ্ট পুঁজিদাতাদের পুঁজি নির্দিষ্ট ব্যবসায় খাটালে উক্ত ক্রেতার নিকট থেকে মূল্য আদায় না হওয়া পর্যন্ত পুঁজিদাতা পুঁজি ফেরত দাবী করতে পারে না অথচ জমাকারীগণ যে কোন সময়ে তাদের পুঁজি ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা চেয়ে থাকে।
আর তাই পুঁজিদাতাদের পুঁজিকে পৃথকভাবে ব্যবসায় খাটানো সম্ভব হয় না বিধায় আধুনিক ব্যবস্থায় ব্যাংকারগণ ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে যে পদ্ধতির অনুসরণ করেন তা হলো পুঁজি বিনিয়োগের মেয়াদের ভিত্তিতে সকল পুঁজিদাতাদেরকে একেকটি গ্রুপে ভাগ করা হয়। অতঃপর প্রত্যেক গ্রুপের জন্য মুনাফার আলাদা বণ্টন হার নির্ধারণ করা হয় এবং প্রতিটি গ্রুপকে একটি পুঁজিদাতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয় ও উক্ত গ্রুপসমূহের প্রত্যেকটির পুঁজি বিনিয়োগ করে যে মুনাফা অর্জিত হয় তার একটি অংশ উক্ত গ্রুপভুক্ত পুঁজিদাতাদের হিসেবে তাদের পুঁজির স্থিতি অনুপাতে বণ্টন করা হয়।

যেমন ঃ মেয়াদ ও হিসাবের ধরন অনুসারে সকল পুঁজিদাতাদেরকে মোট দশটি গ্রুপে ভাগ করা হলো –
১. স্বল্প সময় নোটিশ জমা।
২. সঞ্চয়ী মুদারাবা জমা।
৩. তিন মাস মেয়াদী মুদারাবা জমা।
৪. ছয় মাস মেয়াদী মুদারাবা জমা।
৫. এক বছর মেয়াদী মুদারাবা জমা।
৬. দুই বছর মেয়াদী মুদারাবা জমা।
৭. তিন বছর মেয়াদী মুদারাবা জমা।
৮. পাঁচ বছর মেয়াদী মুদারাবা জমা।
৯. আট বছর মেয়াদী মুদারাবা জমা।
১০. দশ বছর মেয়াদী মুদারাবা জমা। ইত্যাদি

অতঃপর মুনাফার বণ্টনের বিষয়ে নীতি গ্রহণ করা হলো –
১. স্বল্প সময়ের জমাকারীদেরকে মুনাফার -%
২. সঞ্চয়ী হিসাবে জমাকারীদেরকে মুনাফার -%
৩. তিন মাস মেয়াদী জমাকারীদেরকে -% ইত্যাদি হারে মুনাফা বণ্টন করা হবে।

এখন ছয় মাস অন্তর বা বছরে সকল মুদারাবার পুঁজি খাটিয়ে যে মুনাফা অর্জিত হয় সে মুনাফাকে বিভিন্ন গ্রুপের স্থিতি অনুসারে প্রথমে ভাগ করা হয়। অতঃপর প্রত্যেক গ্রুপের প্রাপ্ত মুনাফাকে ঐ গ্রুপের প্রত্যেক পুঁজিদাতার স্থিতি অনুপাতে বণ্টন করা হয়। যেহেতু এ হিসাব হয়ে থাকে বৎসরান্তে সেহেতু বছরের যে কোন সময়ে পুঁজি প্রত্যাহারকারীকে মুনাফা দেয়ার স্বার্থে পূর্ববর্তী বছরসমূহের অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন গ্রুপের জন্য প্রভিশনাল মুনাফার রেট নির্ধারণ করা হয় এবং সে রেটে প্রচলিত মুনাফার বিপরীতে অগ্রীম দেয়া হয়। বছর শেষে প্রকৃত মুনাফা হিসাব করে কম বেশী সমন্বয় করা হয়। কিন্তু ঐ তারিখে যাদের স্থিতি থাকে না তাদের ক্ষেত্রে কোন পক্ষেরই দায়-দাবী থাকে না। ইসলামী শরীয়া ঠিক যে ধরনের মুদারাবা পদ্ধতির রূপরেখা দিয়েছে যদিও ব্যাংকসমূহ কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতিটি তার হুবহু অনুরূপ নয় তথাপিও বর্তমান কালের ইসলামী চিন্তাবিদগণ এ পদ্ধতিটিকে জায়েয মনে করেন। কেননা পুঁজিদাতাদের পুঁজির সাথে মুদারিব বা অন্য কারো পুঁজির সংমিশ্রন হারাম নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন হলো পুঁজিদাতার পুঁজির অনুবর্তী মুনাফাকে সতর্কতার সাথে পৃথক করে তার হাতে প্রত্যার্পণ করা। আর মুনাফার বণ্টন পারস্পরিক সম্মতিতেই হয়ে থাকে। সুতরাং সুদের আবির্ভাব না হলে মুনাফার বণ্টনগত ত্রুটি পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমে হালাল হতে পারে। অতএব এক্ষেত্রে দৃঢ়তার সাথে সতর্ক থাকতে হবে যাতে কোনভাবেই সুদের আবির্ভাব না ঘটে।
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া
জনসংখ্যা- ১৮ লাখ
মুসলমান- ৪০ ভাগ
অর্থনৈতিক খাতের পরিধি- ৩৮৭.৫ বিলিয়ন ডলার
ইসলামী অর্থনীতি- ৫০ বিলিয়ন ডলার বা মোট অর্থনৈতিক খাতের ১২.৯ ভাগ
সংশ্লিষ্ট খাতে প্রধান ব্যাংক- এইচএসবিসি, ব্যাংক ইসলাম মালয়েশিয়া, প্র“ডেনশিয়াল।

দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত
জনসংখ্যা – ১৭ লাখ ৭১ হাজার
মুসলমান- ৯৬ ভাগ
অথর্খনৈতিক খাতের পরিধি- ৩৪০ বিলিয়ন ডলার
ইসলামি অর্থনীতি- ৪৬.৩ বিলিয়ন ডলার বা মোট অর্থনৈতিক খাতের ১৩.৫ ভাগ
সংশ্লিষ্ট খাতে প্রধান- নূর ইসলামি ব্যাংক, দুবাই ইসলামিক ব্যাংক, এমিরেটস ইসলামিক ব্যাংক।

মানামা, বাহরাইন
জনসংখ্যা – ৭ লাখ ১৮ হাজার
মুসলমান- ৮১.২ ভাগ
অর্থনৈতিক খাতের পরিধি- ২৫১ বিলিয়ন ডলার
ইসলামী অর্থনীতি- ১৬.৪ বিলিয়ন ডলার বা মোট অর্থনৈতিক কাতের ৬.৫ ভাগ
সংশ্লিষ্ট খাতে প্রবীন ব্যাংক- অর্থনৈতিক খাতের ৬.৫ ভাগ আরকাপিটা ব্যাংক, গলফ ফাইনান্স হাউস, আল-বারাকা ব্যাংকিং গ্র“প, শামিল ব্যাংক এবং বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক।

দোহা, কাতার
জনসংখ্যা- ১০ লাখ
মুসলমান- ৭৭.৫ ভাগ
অর্থনৈতিক খাতের পরিধি- ৮১.৩ বিলিয়ন ডলার
ইসলামী অর্থনীতি- ১৪.৮ বিলিয়ন ডলার বা মোট অর্থনৈতিক খাতের ১৮.২ ভাগ।
সংশ্লিষ্ট খাতে প্রধান ব্যাংক- আরকাপিটা ব্যাংক, গলফ ফাইনান্স হাউস, আলবারাকা ব্যাংকিং গ্র“প, শামিল ব্যাংক এবং বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক।

লন্ডন, যুক্তরাজ্য
জনসংখ্যা- ৭৬ লাখ
মুসলমান- ৮ ভাগ
অর্থনৈতিক খাতের পরিধি- ১৯.১ ট্রিলিয়ন ডলার
ইসলামী অর্থনীতি- ১০ বিলিয়ন ডলার বা লন্ডনের অর্থনীতির প্রায় ০.০৫ ভাগ
সংশ্লিষ্ট খাতে প্রধান ব্যাংক- ইসলামিক বাংক অব ব্রিটেন, এইচএসবিসি, ইউরোপিয়ান ফাইন্যান্স হাউস (কাতার ইসলামিক ব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান)

সিঙ্গাপুর
জনসংখ্যা- ৫০ লাখ ৭৬ হাজার
মুসলমান- ১৪.৯ ভাগ
অর্থনৈতিক খাতের পরিধি- ২৭.৬ বিলিয়ন ডলার
ইসলামী অর্থনীতি- ১.৮ বিলিয়ন ডলার বা মোট অর্থনৈতিক খাতের ৬.৫ ভাগ
সংশ্লিষ্ট খাতে প্রধান ষ্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, ইসলামী ব্যাংক অব এশিয়া, মালায়ান ব্যাংক।

বিনিয়োগ/ব্যবসা
ইসলামী ব্যাংক পূর্ব বর্ণিত পদ্ধতিতে পুঁজি সংগ্রহের পর তা ব্যবহার করে মুনাফা অর্জনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে থাকে। পুঁজি সংগ্রহের মূল উদ্দেশ্যই হল তা খাটিয়ে মুনাফা অর্জন করা। সুদী ব্যাংকসমূহ তাদের সংগৃহীত পুঁজি সরাসরি নগদ ঋণ হিসেবে প্রদান করে তার উপর সুদ চার্জ করে আয় অর্জন করে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংক প্রত্যক্ষভাবে ঋণ দিয়ে তার উপর কোন চার্জ করে উপার্জন করতে পারে না। তাকে ইসলাম অনুমোদিত পদ্ধতিতে হালাল ব্যবসায় টাকা খাটিয়ে মুনাফা অর্জন করতে হয়। এ লক্ষ্যে ব্যাংকসমূহ মুদারাবা, মুশারাকার ভিত্তিতে পুঁজি বিনিয়োগে, স্থায়ী সম্পদ ক্রয় করে তা ভাড়ায় খাটিয়ে এবং প্রত্যক্ষভাবে পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যমে মুনাফার্জন করে থাকে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ইসলামী ব্যাংকসমূহ যদি বাস্তবে এ সকল পদ্ধতির অনুসরণ না করে তবে সুদের আবির্ভাব হবে। ফলে শরীয়া ব্যাংক হিসেবে ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও এ ব্যাংকসমূহ সুদী কারবারেই নিয়োজিত হয়ে পড়বে। তাই ইসলামী ব্যাংকার, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগ গ্রহীতাকে পূর্বেই ইসলামী পদ্ধতিসমূহ যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিং নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এ পর্যায়ে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং এ সকল পদ্ধতিতে সুদের আবির্ভাবের প্রক্রিয়া আলোচনা করব।

মুশারাকা
যে সকল বিনিয়োগ পদ্ধতির সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার শুরু হয়েছিল তার অন্যতম হল মুশারাকা বা অংশিদারি ব্যবসা। অংশিদারির ভিত্তিতে ব্যবসা একটি পরিপূর্ণ ইসলাম অনুমোদিত পদ্ধতি। অংশিদারিত্ব দু’ধরনের। মালিকানাভিত্তিক অংশিদারিত্ব এবং চুক্তিভিত্তিক অংশিদারিত্ব। মালিকানাভিত্তিক অংশিদারিত্ব হলো যৌথভাবে কোন সম্পত্তি খরিদ করে বা অন্য কোনভাবে অর্জন করে মালিকানা স্বত্ব লাভ করা। অপরদিকে চুক্তির ভিত্তিতে যে অংশিদারিত্ব স্থির হয় তা হলো চুক্তিভিত্তিক অংশিদারিত্ব। চুক্তিভিত্তিক অংশিদারিত্ব সম্পন্ন হওয়ার শর্ত হলো প্রস্তাব ও প্রস্তাব গ্রহণ। অর্থাৎ একজন অংশীদার হওয়ার জন্য প্রস্তাব করবে এবং অপরজন তার প্রস্তাব কবুল করে নিবে। চুক্তি ভিত্তিক অংশিদারিত্ব চার প্রকার।
১. মুফাওযা (সমঅংশিদারিত্ব)।
২. শিরকাতুছ ছানায়ে (পেশাগত অংশিদারিত্ব)।
৩. শিরকাতুল উজুব (পরিচয়ভিত্তিক অংশিদারিত্ব)।
৪. শিরকাতুল আনান (দায় এড়িয়ে যাওয়া)।

মুফাওযা
মুফাওযা এমন প্রকৃতির অংশীদার যে, দুই ব্যক্তি নিজেদের সম্পদের ক্ষেত্রে এবং সম্পদ পরিচালনার ক্ষেত্রে আর ঋণের ক্ষেত্রে সমভাবে অংশীদার হয়। এটা হচ্ছে সাধারণের ব্যবসার সাধারণ অংশিদারিত্ব। এ প্রক্রিয়ায় উভয়ের প্রত্যেকে অংশিদারির বিষয়টি অপরের হাতে নিঃশর্তভাবে ন্যস্ত করে। একজন অপরের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে পারে। চুক্তি দ্বারা এ ব্যবসা পরিচালিত হতে পারে। এইরূপ অংশিদারির ক্ষেত্রে উভয় অংশীদার সমানভাবে মূলধন সরবরাহ করে, কারবার পরিচালনায় সমান অধিকার পায়, লাভ-লোকসানও সমানভাবে বণ্টিত হয়। দায় ও উভয়েই সমানভাবে বহন করে।

এই অংশীদারি ব্যবসার ক্ষেত্রে কতিপয় শর্ত প্রযুক্ত হয়।
>>ব্যবসার প্রকৃতি ও অবস্থা এমন হবে যে, যে কোন পর্যায়ে উভয়ের মধ্যে সমতা রক্ষা করা সম্ভব হয়।
>> উভয় অংশীদারকেই প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হবে।
>> কাফের ও মুসলমানের মধ্যে শিরকাতুল মুফাওয়ায বৈধ নয়।
>> দুই দাসের মাঝে, দুই বালকের মাঝে, দুই মুকাতাবের মাঝে শিরকাতুল মুফাওযা জায়েয নেই।
শিরকাতুল মুফাওযা একটি সুন্দর ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবসা পদ্ধতি। ইসলামী ব্যাংক এ পদ্ধতিতে কোন উদ্যোক্তার প্রস্তাব-স্বীকৃতি দিয়ে অংশীদারি ব্যবসা করে। যে কোন হালাল ব্যবসায় ইসলামী ব্যাংক ও অপর কোন উদ্যোক্তা সমান মূলধন সরবরাহ করে এ প্রকৃতির ব্যবসা শুরু ও পরিচালনা করতে পারে। বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে শুরু করে যে কোন পণ্যের ব্যবসা এ পদ্ধতিতে করা যেতে পারে। অবশ্য এ পদ্ধতিতে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে ব্যবসা ক্লোজ করতে চাইলে তা উভয়ের মধ্যে সমবণ্টন সম্ভব কিনা ? বর্তমান যুগে শিল্প প্রতিষ্ঠানও বিক্রয়ের মাধ্যমে নগদায়ন করা এবং উভয়ের মধ্যে সমবণ্টন সম্ভব। সুতরাং শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। তবে এ পদ্ধতিতে ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে ব্যাংককে কতিপয় বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ পদ্ধতিটি খুবই ঝুঁকি বহুল, অথচ ব্যাংককে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখার জন্য মুদারিবদের টাকা যথাযথভাবে পূর্ণ নিরাপত্তাসহ ফেরত দেয়ার বিষয়ে সজাগ থাকা একটি নৈতিক দায়িত্ব। তাই এই পদ্ধতির অনুসরণের পূর্বে ব্যাংককে প্রথমেই খুব সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতে হবে যে ব্যবসাটি শুরু করা হচ্ছে তার বাজার কেমন, ভবিষ্যৎ চাহিদা কেমন থাকবে, বিভিন্ন পদ্ধতির ঝুঁকির মাত্রা কতটুকু। যেমন ঃ পণ্যটি পচনশীল কিনা, কোনরূপ নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা আছে কিনা, বাজার স্থিতিশীল কিনা, গুদামজাত করার যোগ্য পণ্য কিনা, সহজে বিক্রয়যোগ্য কিনা ইত্যাদি। অতঃপর উদ্যোক্তা অংশীদারের অভিজ্ঞতা, সততা, আমানতদারিতা, সত্যবাদিতা, দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও পরিশ্রম করার মানসিকতা ইত্যাদি নিবিড় ও সুক্ষ্মভাবে যাচাই করতে হবে। এই সকল বিষয়ের কোন একটির অনুপস্থিতির কারণে ব্যবসায় বিশাল ক্ষতির বোঝা নেমে আসতে পারে।
আরও একটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে পুঁজি প্রত্যাহার করা হলে কি ধরনের লোকসানের উদ্ভব হতে পারে। যে সকল প্রকৃতির ব্যবসায় ঝঁহশ ঈড়ংঃ বেশী সে সকল ব্যবসায় পুঁজি প্রত্যাহারের ক্ষতিও হয় বেশী। আর পুঁজি প্রত্যাহারের লোকসান যে ব্যবসায় বেশী তা ব্যাংকের জন্য খুবই ঝুঁকি বহুল। সুতরাং ব্যবসার প্রকৃতি এমন হওয়া চাই যা থেকে সহজেই পুঁজি প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়। অংশীদার কর্তৃক যাতে কোনরূপ অনৈতিক কাজ হতে না পারে তার জন্য ব্যাংকের পক্ষেও এক বা একাধিক দক্ষ, অভিজ্ঞ, সৎ ও আমানতদার কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য নিয়োগ করা যেতে পারে। সব থেকে ভাল হয় যদি অর্থ ও হিসাব পরিচালনায় দক্ষতা সম্পন্ন কাউকে অর্থ ও হিসাব দেখার কাজে নিয়োগ করা যায়। ব্যবসার গৃহীত নীতি ও সিদ্ধান্তসমূহ শাখা ব্যবস্থাপক মাঝে মাঝে পরীক্ষা করে দেখবেন।

শিরকাতুল আনান
আনান অর্থ এড়িয়ে যাওয়া। শিরকাতুল আনান একটি সুবিধাজনক অংশীদারি পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে অংশীদারগণ যে কোন অনুপাতে মূলধন সরবরাহ করতে পারে। মুনাফাও নিজেদের সুবিধাজনক যে কোন অনুপাতে বণ্টন করতে পারে। ব্যবসার লোকসান বণ্টন হয় মূলধন অনুপাতে অর্থাৎ মুনাফা চুক্তির ভিত্তিতে ও লোকসান মূলধনের ভিত্তিতে বণ্টিত হবে এবং প্রত্যেকের নিজের দায় নিজে বহন করে। এ পদ্ধতিতে মুফাওযা পদ্ধতির কতিপয় সমস্যা এড়ানো সম্ভব হয়। যেমন ঃ মুফাওযা পদ্ধতিতে উভয়েরই মূলধন সমান হওয়া আবশ্যক। অনেক ক্ষেত্রেই তা সম্ভব হয় না। কারণ কখনো উদ্যোক্তার সামর্থের সীমাবদ্ধতা আবার কখনো ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঝুঁকি গ্রহণের সুযোগ কম থাকা। কেননা কখনো কখনো ব্যাংক মুদারিবকে অর্থ দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অর্ধেক ঝুঁকি গ্রহণকে যথার্থ মনে করে না। শিরকাতুল আনানের ক্ষেত্রে ব্যাংক উদ্যোক্তাকে ব্যবসার ৩০% বা ২০% বা ১০% বিনিয়োগ করে ব্যবসার গতি-প্রকৃতি, লাভের অবস্থা, ব্যবসায়ীর সততা ও দক্ষতা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণের পর পর্যায়ক্রমে ব্যবসা প্রসার করে ব্যাংকের পুঁজির অনুপাত বৃদ্ধি করতে পারে। অপরদিকে এমন উদ্যোক্তা আছে যারা পরীক্ষিত অথচ ৫০% মূলধনের যোগান দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। এরূপ উদ্যোক্তাগণ অধিকাংশ ব্যাংকের মূলধনে ব্যবসা করার সুযোগ পাবেন। দ্বিতীয়ত ঃ অনেক ক্ষেত্রে এমন হয় যিনি মূলতঃ ব্যবসা পরিচালনা করেন তার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, শ্রম ও সময়দান অনেক বেশী হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় মুনাফা মূলধন অনুপাতে বণ্টিত হলে ব্যাংক অধিক মূলধন দেয়ার কারণে অধিকাংশ মুনাফারই মালিক হয়ে যাবে আর মূল উদ্যোক্তা মুনাফার কিয়দংশ পাবে। ফলে উদ্যোক্তাগণ আগ্রহসহ এ পদ্ধতি গ্রহণ করবে না। যেহেতু এ পদ্ধতিতে মুনাফার হার চুক্তি দ্বারা নির্ধারিত হয় সেহেতু উভয় পক্ষ নিজেদের সুবিধানুসারে মুনাফার হার নির্ধারণ করতে পারে।  লোকসান বণ্টনের ক্ষেত্রে যদি এরূপ হয় যে সমুদয় পুঁজিই বিনষ্ট হয়ে যায় আর ব্যাংকের মূলধন বেশী থাকে এবং মুনাফার অনুপাত কম থাকে আর মুনাফার হার অনুপাতে লোকসান বণ্টন করা হয় তবে উদ্যোক্তা অংশীদারকে ব্যবসার মূলধনের বাইরে থেকে অর্থ যোগান দিয়ে লোকসান বহন করতে হবে। উদ্যোক্তার এইরূপ সামর্থ নাও থাকতে পারে। এক্ষেত্রে মূলধন অনুপাতে লোকসান বণ্টনই অধিকতর সুবিধাজনক ও ন্যায়সঙ্গত।

শিরকাতুল উজুব (পরিচয়ভিত্তিক অংশীদারি)
যখন একাধিক ব্যক্তি মূলধন ছাড়াই নিজেদের পরিচিতি, সুনাম ও আস্থাভাজনতাকে কাজে লাগিয়ে অংশীদারি ব্যবসা করে তাকে শিরকাতুল উজুব বা পরিচয়ভিত্তিক অংশীদারি বলে। পরিচয়ভিত্তিক অংশিদারির রূপ এই যে, মূলধন নেই এমন দু’জন এই শর্তে অংশীদারি চুক্তি করলো যে, তারা নিজেদের পরিচয় (ও আস্থাকে) কাজে লাগিয়ে ক্রয় ও বিক্রয় করবে এই ভিত্তিতে অংশীদারি বৈধ হবে। আধুনিককালে দেশীয় ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডেফার্ড পেমেন্ট শর্তে এল/সির মাধ্যমে পণ্যের বেচা-কেনা হয়ে থাকে। ব্যাংক তার সুনাম ব্যবহার করে এই পদ্ধতিতে অংশিদারির ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে।

ইজারা
ইসলামী ব্যাংকের আয়ের অন্যতম উৎস হলো স্থায়ী সম্পদ ক্রয় বা প্রকিউর করে তা ভাড়ায় খাটানো। ইজারা সংক্রান্ত শরীয়ার বিধান ইতিমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে। ইজারার বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে ইসলামী ব্যাংকসমূহে ব্যাপকভাবে প্রচলিত পদ্ধতিটি হলো ক্রমহ্রাসমান অংশীদারিত্ব পদ্ধতি বা ঐরৎব ঢ়ধৎপযধংব ঝযরৎশধঃঁষ গবরষশ (ঐচঝগ) . এই পদ্ধতিতে ব্যাংকসমূহ সাধারণতঃ ভারী শিল্পের মেশিনারীজ, পরিবহন, বাড়ি ইত্যাদিসহ স্থায়ী জাতীয় সম্পদ গ্রাহকের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ক্রয়, অর্জন বা নির্মাণ করে। অতঃপর ব্যাংকের অংশটি গ্রাহকের কাছে ভাড়া দিয়ে আয় অর্জন করে এবং নির্ধারিত কিস্তির বিনিময়ে গ্রাহকের কাছে বিক্রয় করে। গ্রাহক কিস্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধের পর সম্পদটির নিরঙ্কুশ মালিকানা লাভ করে এবং ব্যাংককে আর ভাড়া পরিশোধ করতে হয় না। সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধের পূর্ব পর্যন্ত ব্যাংকের মালিকানা থাকে এবং গ্রাহক উক্ত সম্পদ ব্যবহারের জন্য ব্যাংককে ভাড়া প্রদান করে।
ক্রয়-বিক্রয়
ইসলামী ব্যাংকসমূহের ব্যবসা পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম হলো হালাল পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়। ব্যাংক তার নিজস্ব পুঁজি এবং মুদারাবার ভিত্তিতে গৃহীত পুঁজি এবং আরিয়াকৃত অর্থ দ্বারা বাজার হতে বিভিন্ন পণ্য ক্রয় করে ক্রয় মূল্যের সাথে মুনাফা যোগ করে তার গ্রাহকের কাছে বিক্রয় করে। আবার ব্যাংক তার গ্রাহক হতে কোন পণ্য ক্রয় করে তৃতীয় পক্ষের নিকট বিক্রয় করেও মুনাফা অর্জন করে। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক তার গ্রাহককে যে সুবিধা দিয়ে থাকে তা হলো মূল্য পরিশোধের জন্য সময়দান অর্থাৎ বাকীতে বিক্রয়। অপরদিকে পণ্য প্রাপ্তির পূর্বে মূল্য পরিশোধ অর্থাৎ অগ্রীম ক্রয়। সাধারণভাবে প্রচলিত ব্যবসার ক্ষেত্রেও বাকীতে পণ্য বিক্রয় এবং পণ্য ক্রয়ের জন্য অগ্রীম অর্থ পরিশোধের ধারা প্রচলিত রয়েছে। ইসলামও এ দু’টি পন্থাকে সম্পূর্ণ জায়েয রেখেছে। এ পদ্ধতিতে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক বাকিতে বিক্রকৃত পণ্যের মূল্য আদায় নিশ্চিত করার জন্য বা অগ্রীম প্রদত্ত অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত পণ্য পাওয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গ্রাহক থেকে উপযুক্ত জামানত গ্রহণ করতে পারে।

বাই-এ নাফিয
যে ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মাল তাৎক্ষণিকভাবেই ক্রেতার মালিকানায় চলে যায় তা হলো বাই-এ নাফিয। বাই-এ নাফিযের জন্য যে সকল শর্ত রয়েছে তা হলো –
>> ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কে প্রাপ্ত বয়স্ক, পূর্ণ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন হতে হবে।
>> একই বিষয়ে ইজাব এবং কবুল হতে হবে।
>> বিক্রিতব্য বস্তু মওজুদ হতে হবে।
>> বস্তুটি স্বত্ব হওয়ার যোগ্য হতে হবে।
>> বিক্রেতা নিজে বিক্রিতব্য পণ্যের মালিক বা বিক্রয়ের ক্ষমতা সম্পন্ন প্রতিনিধি হতে হবে।
>> বস্তুটির মধ্যে ব্যবহার যোগ্যতা থাকা আবশ্যক।
>> পণ্যটি বিক্রেতা ব্যতীত অন্য কারো স্বত্বমুক্ত হতে হবে।
>> চিরস্থায়ীভাবে স্বত্ব স্থানান্তরের সংকল্প থাকতে হবে। সাময়িক স্থানান্তর বা সাময়িক বিক্রয়ের শর্ত থাকতে পারবে না।

বাই-এ বাতিল
যে ক্রয়-বিক্রয় কোনভাবেই শুদ্ধ হয় না তা-ই হলো বাই-এ বাতিল। যেমনঃ এমন কোন বস্তুর ক্রয় বিক্রয় বাস্তবে যার উপর বিক্রেতার কোন সত্ত্ব নেই।
বাই-এ ফাসিদ
যে বাই-এ ত্রুটি থাকে তবে ক্রীত মাল হস্তগত হওয়ার পর ক্রেতার মালিকানা স্বত্ব প্রমাণিত হয় কিন্তু কোনরূপ ব্যবহার, খাওয়া-দাওয়া বা উপযোগীতা লাভ করা যায় না বা হালাল হয় না তা-ই বাই-এ ফাসিদ। যেমন ঃ
>> দুই বিনিময় বস্তুর একটি যদি হারাম হয় তবে বিক্রয় চুক্তি ফাসিদ হবে। যেমন ঃ মৃত, রক্ত, মদ, শুকরের বিনিময়ে বিক্রি।
>>শিকার করার পূর্বে মাছ, শূণ্যে উড়ন্ত পাখি, গর্ভস্থ বাচ্চা, গাছে থাকা ফল আন্দাজে পরিমাপ করা ইত্যাদি বিক্রয়।
>> এমন শর্তে বিক্রয় যা বিক্রয়ের পরিপন্থী।
বাই-এ মাওকুফ
কেউ অপর কারো বস্তু তার বিনা অনুমোতিতে বিক্রয় করলে বস্তুটির মূল মালিকের বিনা অনুমতিতে বিক্রয় করার কারণে বস্তুটির উপর ক্রেতার মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ ধরণের বাই হলো বাই-এ মাওকুফ। পরবর্তীতে মূল মালিক উক্ত ক্রয়-বিক্রয়ের অনুমোদন দিলে ক্রেতার মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও কিছু কিছু বিক্রয় শরীয়তে মাকরূহ্ হিসেবে বিবেচিত। যেমন ঃ ধোঁকাবাজি ও প্ররোচিত করার মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয়, একে অন্যের দামের উপর বাড়িয়ে কমিয়ে দাম বলে ক্রয়-বিক্রয়। মূল্যের দিক থেকেও বাই চার প্রকার। তা হলো তাওলিয়া, মুরাবাহা, যায়’আ ও মুসাওয়ামাহ্। যখন কোন পণ্য প্রকৃত ক্রয় মূল্যেই ক্রেতা বিক্রয় করে তা হলো তাওলিয়া, যখন ক্রেতা-বিক্রেতা সমঝোতার ভিত্তিতে ক্রয় মূল্যের সাথে মুনাফা যোগ করে বিক্রয় করে তা হলো মুরাবাহা এবং ক্রয়মূল্য অপেক্ষা কম মূল্যে বিক্রয় করলে তা হবে যায়’আ। আর যখন পূর্ব দাম অর্থাৎ ক্রয়মূল্য অগ্রাহ্য পূর্বক ক্রেতা-বিক্রেতার যৌথ সম্মতিক্রমে মূল্য ধার্য করে ক্রয়-বিক্রয় করা হয় তাকে বলা হয় মুসাওয়ামাহ্। মূল্য পরিশোধের সময় অনুসারে আরও দুটি প্রকার পাওয়া যায়। তা হলো বাই মুয়াজ্জাল ও বাই সালাম।
ইসলামী ব্যাংকসমূহ সাধারণতঃ যে পদ্ধতির অনুসরণ করে তা হলোঃ

বাইমুয়াজ্জাল
বাই মুয়াজ্জাল হল এমন প্রকৃতির বিক্রয় যেখানে বিক্রেতা ক্রেতার নিকট পণ্য মূল্য ভবিষ্যতের কোন নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধের শর্তে পণ্যের মালিকানা ও দখলীস্বত্ব তাৎক্ষণিকভাবে হস্তান্তর করে। এ পদ্ধতিতে ব্যাংক গ্রাহকের চাহিদা মোতাবেক পণ্য বাজার হতে ক্রয় করে তার সাথে প্রত্যাশিত মুনাফা যোগ করে ক্রেতার নিকট বিক্রয় করে। এ পদ্ধতিতে ব্যাংক ক্রেতাকে পণ্যের ক্রয়মূল্য জানাতে বাধ্য নয়। তবে বর্তমানে প্রচলিত প্রথানুসারে দেখা যায় ব্যাংক গ্রাহকের পছন্দসই পণ্য সরবরাহ করার লক্ষ্যে ক্রেতার পছন্দমত উৎস হতে তারই পছন্দের পণ্যটি ক্রয় করে দেয়। আবার যেক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃতিগত জটিলতার কারণে ব্যাংকের পক্ষে বাজার হতে পণ্যটি প্রত্যক্ষভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না সে ক্ষেত্রে ব্যাংক ক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ করে পণ্যটি ক্রয় করে সরবরাহ করে। এক্ষেত্রে প্রায়ই বিনিয়োগ গ্রহীতাকেই ক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়ে থাকে। ফলে প্রায়ই উক্ত পণ্যের ক্রয় মূল্যও গ্রাহকের জানা থাকে। অবশ্য এরূপ জানা থাকাতে কোন সমস্যা নেই।

মুরাবাহা
মুরাবাহা ইসলামী ব্যাংকসমূহের অন্যতম বিনিয়োগ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে ব্যাংক গ্রাহকের চাহিদা অনুসারে নির্ধারিত পণ্য ক্রয় করে পারস্পরিক সম্মতিতে নির্ধারিত হারে মুনাফা যোগ করে উক্ত পণ্য গ্রাহকের নিকট নগদে বা নির্ধারিত মেয়াদে বিক্রয় করে। বাই মুয়াজ্জালের সাথে এর অন্যতম পার্থক্য হলো বাই মুয়াজ্জালে ব্যাংকের মুনাফার হার গ্রাহককে জানানো বাধ্যতামূলক নয়। অপরদিকে মুরাবাহার ক্ষেত্রে ব্যাংক যে পরিমাণ মুনাফা করে তা গ্রাহককে জানানো বাধ্যতামূলক। ব্যাংক ক্রয়মূল্যের সাথে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে নির্ধারিত মুনাফার অতিরিক্ত আদায় করতে পারে না। তবে উক্ত পণ্যের প্রসেসিং খরচ ও বহন খরচ যোগ করা জায়েয। মুরাবাহা হলো প্রথম চুক্তির মাধ্যমে যে জিনিসটির মালিকানা লাভ করেছে সেটাকে অতিরিক্ত লাভসহ প্রথম মূল্যের উপর হস্তান্তর করা। আর তাওলিয়া হলো প্রথম চুক্তির মাধ্যমে যে জিনিসটির মালিকানা লাভ করেছে সেটাকে অতিরিক্ত লাভ ছাড়া প্রথম মূল্যের বিনিময়ে হস্তান্তর করা। মুরাবাহা একটি শরীয়া সিদ্ধ পদ্ধতি হওয়ায় ইসলামী ব্যাংকসমূহ মুরাবাহা পদ্ধতিতে পণ্য বিক্রয় করে মুনাফা অর্জন করে থাকে। ইসলামী ব্যাংক সাধারণতঃ মুরাবাহার ক্ষেত্রে পণ্য ক্রয়ের পূর্বেই পণ্য ক্রয়ের নিশ্চয়তা স্বরূপ ক্রেতার কাছ থেকে নগদ জামানত গ্রহণ করে থাকে। ব্যাংক পণ্য ক্রয়পূর্বক নিজস্ব দখলে নেয়ার পর মালিকানা স্বত্ব ক্রেতার নিকট হস্তান্তর করে। তবে পণ্যমূল্য আদায় নিশ্চিত করার স্বার্থে জামানতস্বরূপ পণ্যের দখলি স্বত্ব ব্যাংক ধরে রাখতে পারে এবং মূল্য আদায় সাপেক্ষে আনুপাতিক হারে বা সম্পূর্ণ পণ্য ক্রেতার নিকট হস্তান্তর করে থাকে।

বাই সালাম
বাই সালাম ইসলামসম্মত একটি ক্রয় পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে ব্যাংক বিক্রয়যোগ্য পণ্য অগ্রীম ক্রয় করে বিক্রেতাকে তার মূল্য পণ্য প্রাপ্তির পূর্বেই প্রদান করে থাকে। অতঃপর নির্ধারিত সময় পরে ব্যাংক উক্ত পণ্যের ডেলিভারী গ্রহণ করে তার সাথে মুনাফা যোগ করে তৃতীয় পক্ষের নিকট বিক্রয় করে লাভ করতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংক পণ্য ক্রয়ের পূর্বেই উক্ত পণ্য বিক্রয়ের জন্য পণ্যের পরিমাণ ও নমুনা উল্লেখপূর্বক তৃতীয় পক্ষের সাথে বিক্রয় চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারে। এক্ষেত্রে পণ্যের বিক্রেতাও ব্যাংককে উক্ত পণ্য বিক্রয়ের সহযোগিতা স্বরূপ ক্রেতার সন্ধান দান বা বিক্রয় চুক্তিতে আবদ্ধ হতে সহযোগিতা করতে পারে। এ পদ্ধতিতে সাধারণতঃ কৃষকদেরকে কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য, শিল্প মালিকদেরকে শিল্পপণ্য উৎপাদনের জন্য উক্ত পণ্যসমূহ আগাম ক্রয় করে উহার মূল্য পূর্বেই প্রদান করা হয়ে থাকে। পরবর্তীতে ব্যাংক নির্ধারিত সময়ান্তে উক্ত পণ্যের সরবরাহ গ্রহণ করে ব্যাংকের সাথে চুক্তিবদ্ধ গ্রাহককে পণ্য সরবরাহ করে মূল্য আদায় করতে পারে। এ পদ্ধতিতে যে কোন উৎপাদনকারী খামার বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্য ক্রয়ের জন্য অগ্রীম মূল্য পরিশোধ করা হয় বিধায় উৎপাদকগণ বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের মালিকগণ তাদের পণ্য আগাম বিক্রয় করে উৎপাদন কার্যকে গতিশীল করতে পারে।
উল্লেখিত বিনিয়োগ পদ্ধতি ছাড়াও ব্যাংক গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় পণ্য, ব্যক্তিগত বাহন, ছোটখাট যন্ত্রপাতি ক্রয়পূর্বক কিস্তিতে বিক্রয় করে মুনাফা অর্জন করে থাকে। এ সকল বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্বাসগত ও পদ্ধতিগতভাবে ইসলামের বিধি-বিধান পরিপালন করা হলে তা সম্পূর্ণরূপে হালাল উপার্জন হিসেবে গণ্য হবে।

বাইয়ে মুরাবাহাহ –
পন্য ক্রয় করে ক্রয়কৃত মূল্যের ওপর নিধারিত লাভসং যোজন করে বিক্রি করার মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করতে পারে । ব্যাংক এ পন্থায় বিনিয়োগ করতে চাইলে,প্রথমে নিজে পন্য ক্রয় করে ঋন গ্রহীতার কাছে তা বিক্রি করবে । ঋন গ্রহীতা যদি অর্থ বাকীতে প্রদান করতে চায়, তাহলে সে ক্ষেত্রে লাভের পরিমাণ বাড়াতে পারবে ।

বৈদেশিক বাণিজ্য
ইসলামী ব্যাংকের আয় উপার্জনের অন্যতম উৎস হলো বৈদেশিক বাণিজ্য। বৈদেশিক বাণিজ্য হতে ইসলামী ব্যাংকসমূহ মোট আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অর্জন করতে পারে। বৈদেশিক বাণিজ্যকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। আমদানী এবং রপ্তানী। সুদূর প্রাচীনকাল হতেই বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রচলন ছিল। এজন্য মানুষ বহু দূর দেশ ভ্রমন করত। আধুনিককালে মানুষ নিজস্ব স্থানে বসেই বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনায় সক্ষম। আর তা সম্ভব হয়েছে মূলতঃ ব্যাংকিং সেবার বদৌলতে। ইসলামী ব্যাংকসমূহ সতর্কতার সাথে কাজ করলে সম্পূর্ণ হালালভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থোপার্জন করতে পারে। ব্যবসাকে শরীয়া সম্মতভাবে পরিচালনার স্বার্থে ইসলামী ব্যাংকসমূহ নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা করে।

আমদানী বাণিজ্য
আমদানী বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক তিনটি পদ্ধতিতে শরীয়া সম্মতভাবে বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারে। যেমন ঃ (১) অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে আমদানী, (২) নিজেই আমদানী করে গ্রাহকের কাছে অধিক মূল্যে বিক্রয় এবং (৩) গ্রাহককে আমদানীতে সহযোগিতা করে বা সেবা দিয়ে আয় অর্জন। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকসমূহ উপরোক্ত পদ্ধতিতেই কাজ করে থাকে। পদ্ধতিগুলো হলো –

নিজে আমদানী করে গ্রাহকের নিকট বিক্রয়
এ পদ্ধতিতে ব্যাংক গ্রাহকের চাহিদানুসারে নিজে আমদানীকারক হিসেবে গ্রাহকের জন্য পণ্য আমদানী করে উক্ত পণ্যের আমদানী মূল্যের সাথে মুনাফা যোগ করে গ্রাহকের নিকট বাকীতে বিক্রয় করে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের সাথে এল সি খোলার পূর্বেই ব্যাংকের ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন হয়। উক্ত চুক্তির ভিত্তিতে গ্রাহক পণ্য সরবরাহ নেয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে কিছু নগদ অর্থ জামানতস্বরূপ ব্যাংকের কাছে জমা রাখে। উক্ত জামানত এল সি মার্জিন হিসেবে পরিচিত। উক্ত জামানত প্রাপ্তির পর এবং চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ব্যাংক পণ্য সরবরাহকারীকে ফরমায়েশ তথা এল সি ইস্যু করে পরবর্তীতে পণ্য সরবরাহকারীগণ পণ্য সরবরাহ করলে ব্যাংক নিজস্ব উৎস হতে উক্ত পণ্যের মূল্য পরিশোধ করে এবং জাহাজী কর্তৃপক্ষের নিকট হতে মালের সরবরাহ গ্রহণ করে নিজস্ব দখলে এনে পরবর্তী সময়ে পূর্ব চুক্তি মোতাবেক গ্রাহকের নিকট এর মালিকানা স্বত্ব হস্তান্তর করে। তবে পণ্যমূল্য গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত উক্ত পণ্যের দখলী স্বত্ব ব্যাংক ধরে রাখতে পারে আবার উপযুক্ত জামানত রেখে টি আর (ঞৎঁংঃ জবপবরঢ়ঃ) এর মাধ্যমে পণ্যের মালিকানার সাথে দখলও গ্রাহককে বুঝিয়ে দিতে পারে। যে ক্ষেত্রে পণ্যের দখলী স্বত্ব ব্যাংক ধরে রাখে সেক্ষেত্রে গ্রাহক পণ্যমূল্য পরিশোধ করে পণ্য সরবরাহ গ্রহণ করে আর যে ক্ষেত্রে টি আর এর মাধ্যমে মালের দখল গ্রাহককে বুঝিয়ে দেয়া হয় সেক্ষেত্রে গ্রাহক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য বিক্রয় করে পণ্যমূল্য পরিশোধের সুযোগ পায়। এ পদ্ধতিটি বিক্রয় বা মুরাবাহা পোষ্ট ইমপোর্ট (এম পি আই) হিসেবে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে পণ্য ক্রয়ে গ্রাহক নিজেও ব্যাংককে সহযোগিতা করতে পারে। যেমন ঃ পণ্যের উৎস নির্বাচন, দর নির্ধারণ, পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি বিষয়ে রপ্তানীকারকের সাথে সমঝোতায় পৌঁছে তার কাছ থেকে ব্যাংকের জন্য কোটেশন সংগ্রহ করে ব্যাংককে সরবরাহ করতে পারে। ব্যাংক গ্রাহকের দেয়া তথ্যানুসারে উক্ত রপ্তানীকারক হতে পণ্য আমদানী করে গ্রাহকের নিকট বিক্রয় করতে পারে। এ পদ্ধতিতে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ব্যাংককে অবশ্যই মনে রাখতে হবে ব্যাংক হলো রপ্তানীকারকের পণ্যের প্রত্যক্ষ ক্রেতা এবং আমদানী পরবর্তী সময়ে স্থানীয় গ্রহীতার কাছে পণ্যের বিক্রেতা।

পণ্য আমদানির জন্য গ্রাহককে সেবা প্রদান
ব্যাংক স্থানীয় আমদানিকারকদেরকে আমদানির ক্ষেত্রে সেবাদানের মাধ্যমেও আয় করতে পারে। সাধারণতঃ আমদানীকারকগণ দেশে থেকেই বৈদেশিক পণ্য আমদানী করে থাকে। এ ক্ষেত্রে যে সমস্যাটি সব থেকে বড় তা হল আমদানীকরকের পণ্যমূল্য পরিশোধ করার পর যথাযথভাবে পণ্য পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং রপ্তানীকারকের ঝুঁকি হলো মূল্য প্রাপ্তির পূর্বে পণ্য রপ্তানী করে তার মূল্য প্রাপ্তির বিষয়ে অনিশ্চয়তা। উভয়পক্ষের ঝুঁকি হ্্রাস করার জন্য উভয়পক্ষই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যাংকের উপর আস্থা স্থাপন করে এবং আমদানীকারকের পক্ষে পণ্যমূল্য পরিশোধের জন্য তার দেশীয় ব্যাংক রপ্তানীকারককে নিশ্চয়তা স্বরূপ লেটার অব ক্রেডিট প্রদান করে এবং রপ্তানীকারকের দেশীয় ব্যাংক উক্ত পণ্যমূল্য আদায়ে মধ্যস্থতা করে। সুতরাং পণ্য আমদানীকারকগণ নিজেরা পণ্য আমদানী করলেও ব্যাংকের সেবা তাদের গ্রহণ করতে হয়। এইরূপ ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্রাহকের পক্ষে এল সি খুলে থাকে। এর বিনিময়ে গ্রাহক হতে সার্ভিস চার্জ গ্রহণ করে থাকে। এইরূপ এল সি খোলার প্রাক্কালে আমদানীকারক পণ্যের সম্পূর্ণ মূল্য ব্যাংকের নিকট জমা রাখে। এইরূপ এল সিকে ১০০% মার্জিন সমেত এল সি বলা হয়। আমদানিকৃত পণ্য জাহাজীকরণের পর বা দেশে পৌঁছার পর অর্থাৎ পূর্বশর্ত মোতাবেক রপ্তানীকারক পণ্য সরবরাহের পর ব্যাংক গ্রাহকের জমাকৃত অর্থ দ্বারা পণ্যমূল্য পরিশোধ করে। এখানে উল্লেখ্য নিজস্ব পণ্য আমদানীর জন্য গ্রাহককে পূর্বেই ১০০% মূল্য পরিশোধ করা নাও লাগতে পারে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহক ব্যাংকের সন্তুষ্টি স্বাপেক্ষে এল সি খোলার প্রাক্কালে আংশিক মূল্য এবং অবশিষ্ট অংশ পণ্যমূল্য পরিশোধের পূর্বে ব্যাংকে জমা দিতে পারে। উল্লেখ্য গ্রাহক কর্তৃক পণ্য আমদানী করা হলে যেক্ষেত্রে গ্রাহক পণ্যমূল্য পরিশোধের পূর্বে অবশিষ্ট অংশ পরিশোধে ব্যর্থ হয় এবং ব্যাংক হতে ঋণ করে অবশিষ্ট মূল্য পরিশোধ করে সেক্ষেত্রে ব্যাংক উক্ত অর্থের উপর কোন অতিরিক্ত চার্জ বা মুনাফা চার্জ করতে পারে না। কেননা এক্ষেত্রে গ্রাহকই হল মূল ক্রেতা এবং রপ্তানীকারক হল বিক্রেতা আর ব্যাংক হল সেবাদানকারী এবং পরবর্তীতে গ্যারান্টর হিসেবে অর্থায়নকারী। ফলে এইরূপ অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক অতিরিক্ত চার্জ করতে পারে না। অবশ্য বর্তমানে অনেক শরীয়া ব্যাংকই গ্রাহক কর্তৃক আমদানীকৃত অর্থাৎ ক্যাশ রিটায়ারমেণ্ট ভিত্তিতে ইস্যুকৃত এল সির বিপরীত আমদানীকৃত মালের ক্ষেত্রেও মুরাবাহা পদ্ধতিতে (এম পি আই) বাকীতে বিক্রয় করে থাকে। আমাদের মতে এইরূপ ক্যাশ এল সির মালামাল মুরাবাহার ভিত্তিতে বাকীতে বিক্রয় করা সঠিক নয়। কেননা, ক্যাশ এল সির ভিত্তিতে পণ্য আমদানী করে পরবর্তীতে গ্রহীতা কর্তৃক পণ্যমূল্য পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে এম পি আই করা হলে দুটি যুক্তি প্রদর্শন করা হতে পারে –
(১) উক্ত পণ্যের রপ্তানীকারককে ব্যাংক মূল্য পরিশোধ করে বিধায় উক্ত পণ্যের মালিকানা ব্যাংকের হয়। সুতরাং ব্যাংক তা গ্রাহকের কাছে বিক্রয় করতে পারে। অথবা
(২) গ্রাহক আমদানীকারক হিসেবে আমদানী করে তার মালিকানা স্বত্ব লাভ করে। সুতরাং ব্যাংক গ্রাহকের নিকট হতে উক্ত পণ্য ক্রয় করতে পারে। অপরদিকে কোন পণ্যের বিক্রেতা পরবর্তীতে ঐ পণ্য ক্রেতার নিকট হতে ক্রয় করতে পারে। সুতরাং গ্রাহক ব্যাংকের নিকট হতে উক্ত পণ্য বাকীতে ক্রয় করতে পারে।
অতএব তাদের মতে নগদ এল সির মালও এম পি আই করা যায়। আমাদের যুক্তি হলো উল্লেখিত কারণে মেয়াদের ভিত্তিতে মুরাবাহার মালামাল ঐ গ্রাহকের কাছে বিক্রয় করা যায় না। কারণ –
(১) মুরাবাহার ভিত্তিতে পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মুনাফার হার পূর্বেই নির্ধারণ করে চুক্তি করা হয় এবং বিক্রেতা তদপেক্ষা বেশী মুনাফা গ্রহন করতে পারে না। আর যে ক্ষেত্রে মূল মূল্যের উপরে বিক্রয় করার চুক্তি করা হয় অর্থাৎ ক্রয়মূল্য ক্রেতার নিকট বিক্রয় করার চুক্তি করা হয় সে ক্ষেত্রে উক্ত বিক্রয়কে বলা হয় তাওলিয়া। যেহেতু গ্রহীতা নগদে অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে জাহাজ হতে পণ্য সরাসরি খালাস করার জন্য এল সি করে সেহেতু এল সি খোলার প্রাক্কালে মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয় না। এ ক্ষেত্রে ব্যাংককে আমদানীকারক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও তা মুরাবাহার পরিবর্তে তাওলিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতএব পরবর্তীতে গ্রাহক কর্তৃক মূল্য পরিশোধ করে মাল খালাস নেয়ার ব্যর্থতার কারণে মুনাফা প্রযুক্ত করে মুরাবাহা করার কোন সুযোগ নেই।
(২) যখন ধরে নেয়া হয় ব্যাংক এল সি খোলার সুবাদে পণ্যমূল্য পরিশোধের বিষয়ে গ্যারাণ্টর সে ক্ষেত্রে গ্রাহকই হলো পণ্যের প্রকৃত আমদানীকারক। সেহেতু আমদানীকারকের পক্ষে ব্যাংক মূল্য পরিশোধ করলে তা ব্যাংকের নিকট আমদানীকারকের ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। ঋণের উপর অতিরিক্ত গ্রহন করা হলে তা সুদ হিসেবে বিবেচ্য হবে। অপরদিকে যদি ধরে নেয়া হয় ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে পণ্য নগদ মূল্যে ক্রয় করে নিবে এবং গ্রাহককে পরিশোধিত পণ্যমূল্য দ্বারা রপ্তানীকারকের পাওনা পরিশোধ করবে এবং ব্যাংক গ্রাহকেঠ

images (7)
(২) যখন ধরে নেয়া হয় ব্যাংক এল সি খোলার সুবাদে পণ্যমূল্য পরিশোধের বিষয়ে গ্যারাণ্টর সে ক্ষেত্রে গ্রাহকই হলো পণ্যের প্রকৃত আমদানীকারক। সেহেতু আমদানীকারকের পক্ষে ব্যাংক মূল্য পরিশোধ করলে তা ব্যাংকের নিকট আমদানীকারকের ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। ঋণের উপর অতিরিক্ত গ্রহন করা হলে তা সুদ হিসেবে বিবেচ্য হবে। অপরদিকে যদি ধরে নেয়া হয় ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে পণ্য নগদ মূল্যে ক্রয় করে নিবে এবং গ্রাহককে পরিশোধিত পণ্যমূল্য দ্বারা রপ্তানীকারকের পাওনা পরিশোধ করবে এবং ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে ক্রয়কৃত পণ্য পুনরায় গ্রাহকের নিকট বাকীতে বিক্রয় করবে তবে তাও সঠিক হবে না। কেননা এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় বাই-এ ফাসেদ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা শরীয়তের মূলনীতি হলো বেচা-কেনায় এমন কোন শর্তারোপ জায়িয নেই যা মূল বেচা-কেনার পরিপন্থী। ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে যদি এ শর্তে পণ্য ক্রয় করে যে গ্রাহক পুনরায় তা ব্যাংকের নিকট হতে অধিক মূল্যে ক্রয় করে নিবে তবে পুনঃবিক্রির এই শর্ত একটি ফাসেদ বা হারাম শর্ত। সুতরাং এ জাতীয় বেচা-কেনা বৈধ নয়।
সুতরাং আমাদের মত হলো নগদ ভিত্তিক এল সির ভিত্তিতে আমদানীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে গ্রহীতাই আমদানীকারক বা ক্রেতা হিসেবে পণ্য আমদানী করে অথবা ব্যাংক আমদানীকারক হলেও প্রথম হতে মুনাফা ধরা হয় না সেহেতু আমদানীর পর গ্রাহক কর্তৃক মূল্য পরিশোধের ব্যর্থতার কারণে ব্যাংক কর্তৃক গ্রাহক হতে পণ্য ক্রয় করে পুনঃবিক্রয় বা তাওলিয়ার পরিবর্তে মুরাবাহা করা সঠিক নয়। আল্লাহ্ই অধিক জ্ঞাত।

রপ্তানী বাণিজ্য:
সেবাদান
রপ্তানী বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাংকের ভূমিকা অপরিহার্য। কেননা রপ্তানীকারকের পণ্যের মূল্য এল/সি প্রদানকারী ব্যাংক হতে আদায় করার জন্য স্থানীয় ব্যাংকের উপর নির্ভর করতে হয়। ব্যাংক এক্ষেত্রে নেগোসিয়েশন করে রপ্তানীকারকের পণ্য মূল্য আদায়ে সহযোগিতা করে। তাছাড়া বৈদেশিক পত্র যোগাযোগসহ বিভিন্ন শর্তের পরিপালনও ব্যাংক নিশ্চিত করে সঠিকভাবে পণ্য আমদানীতে সহযোগিতা করে। এভাবে সেবাদানের মাধ্যমে ব্যাংক রপ্তানী বাণিজ্য হতেও আয় করতে পারে।

প্রত্যক্ষ রপ্তানীর মাধ্যমে আয়
প্রায়ই ব্যাংকের গ্রাহকগণ বৈদেশিক ফরমায়েশ পাওয়া সত্ত্বেও অর্থাভাবে নিজে ফরমায়েশ অনুসারে সমুদয় পণ্য উৎপাদনে সক্ষম হয় না। এরূপ ক্ষেত্রে উক্ত গ্রাহক ফরমায়েশ পত্রটি নিজে না রেখে ব্যাংকের অনুকূলে ন্যস্ত করে এবং ব্যাংক প্রত্যক্ষভাবে উক্ত পণ্য রপ্তানীর জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়। স্থানীয় উৎপাদক হতে ক্রয় করে ক্রয় মূল্যের সাথে মুনাফা যোগ করে রপ্তানী করে মুনাফা অর্জন করে। আর স্থানীয় উৎপাদক যাতে যথাসময়ে পণ্য উৎপাদন করে ব্যাংককে সরবরাহ করতে পারে তার জন্য ব্যাংক বাই সালাম পদ্ধতিতে পণ্যের মূল্য অগ্রীম পরিশোধ করে থাকে।

অংশীদারি পদ্ধতিতে রপ্তানী
ব্যাংক স্থানীয় গ্রাহকের সাথে মুশারাকা বা অংশীদারির ভিত্তিতে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানী করেও মুনাফা অর্জন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক স্থানীয় রপ্তানীকারক কর্তৃক বৈদেশিক ফরমায়েশ প্রাপ্তির পর উক্ত পণ্যের রপ্তানী মূল্য এবং তার উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে যদি এ মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, উক্ত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানী লাভজনক হবে তবে ব্যাংক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানী করে। অর্থাৎ ব্যাংক উক্ত পণ্যের উৎপাদন ব্যয় সরবরাহ, উৎপাদন প্রক্রিয়া তদারকী, রপ্তানী নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে এবং এ রপ্তানী হতে যে মুনাফা অর্জিত হয় তা পূর্ব নির্ধারিত হারে ভাগ করে নেয়। এভাবে ব্যাংক মুশারাকার ভিত্তিতে রপ্তানী করে মুনাফা অর্জন করে।

অন্যান্য সেবা
সেবাদানের বিনিময়ে শ্রমমূল্য/সেবামূল্য বা সার্ভিস চার্জ গ্রহণ করা শরীয়তে জায়েয। ইসলামী ব্যাংক তার গ্রাহকদেরকে বিভিন্ন প্রকার সেবা দিয়ে থাকে এবং এর বিনিময়ে সার্ভিস চার্জ গ্রহণ করে থাকে। এ সকল সার্ভিস চার্জসমূহও ইসলামী ব্যাংকের আয়ের একটি বিশেষ উৎস। ব্যাংকের এ সকল সেবার মধ্যে টি,টি, ডি,ডি ইত্যাদির মাধ্যমে স্থানীয় ও বৈদেশিক অর্থ স্থানান্তর, পে-অর্ডার, ব্যাংক গ্যারান্টি, স্থানীয় লেটার অব ক্রেডিট ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের নিশ্চয়তা প্রদান, গ্রাহকের পক্ষে তার পাওনাদার, কর্মচারীদের পাওনা/বেতন প্রদান, গ্রাহকের পক্ষে তার পাওনাদারদের হতে পাওনা আদায়, বিভিন্ন কোম্পানীর শেয়ার বিক্রয়, সরকারী সেবাদানকারী সংস্থা যেমন ঃ বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ওয়াসা ইত্যাদির পাওনা আদায়, লকার ভাড়া দেয়ার মাধ্যমে গ্রাহকের মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

ইসলামী পুঁজি বাড়াতে ভিন্ন কৌশল
ইসলামী অর্থায়নের পরিমাণ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সুদবিহীন এক ট্রিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ এই অর্থায়নকে এখনই বহুমুখী খাতে ব্যবহার করা উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে আর্থিক খাতে ঝুঁকির পরিমাণ কমিয়ে আনার পাশাপাশি ইসলামী পুঁজির পরিপূর্ণ ব্যবহারও সম্ভব হবে।
ইসলামী আইন অনুযায়ী কেবল সুদের ব্যবসাই হারাম নয়, ফাটকা ব্যবসা ও হারাম পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগও নিষিদ্ধ। এসবের আওতায় রয়েছে পর্নোগ্রাফি, জুয়া, অস্ত্র তৈরি, মদ উৎপাদন, শূকর চাষ ইত্যাদি। ইসলামী অর্থায়নের যেসব সেবা এখন পর্যন্ত বাজারে প্রচলিত রয়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘মুরাবাহা’। এই বিশেষ সেবায় ভোক্তাদের গাড়ি থেকে শুরু করে বাড়ি কেনার জন্য অর্থায়ন করা হয়। ইসলামী অর্থায়নে বন্ডের বিকল্প হিসাবে ব্যবহৃত হয় ‘সুকুক’। ‘সুকুক’ ব্যবহৃত হয় বড় ধরনের বিনিয়োগের অর্থায়ন করতে। আর ‘মুশারাকা’ যার অর্থ অংশীদারিত্বথমূলত ব্যাংক যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে অর্থায়ন করে এবং তার সঙ্গে ওই সম্পদ থেকে অর্জিত মুনাফা বা লোকসান ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়। মূলত, মোটা দাগে ইসলামী অর্থায়নের চালিকাশক্তি হচ্ছে মুনাফার সঙ্গে ঝুঁকিও ভাগ করে নেওয়ার নীতি। বিশ্বব্যাপী ইসলামী অর্থায়ননির্ভর নানা ধরনের সেবা চালু হওয়া সত্ত্বেও কুয়েত অ্যান্ড মিডলইস্ট ফাইনান্সিয়াল কম্পানির সম্পদ বণ্টনবিষয়ক পরিচালক আমরিথ মুক্কামালার মতে তা এখনও সীমিত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের জন্য ইসলামী অর্থায়নের সেবার পরিমাণ চাহিদার তুলনায় এখনো অনেক সীমিত। এর সম্ভাবনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা উচিত।’ কুয়েতের অপর অর্থনীতিবিদ হাজ্জাজ বাখডার অবশ্য এর সঙ্গে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামী পুঁজির সেবার ধরন ও প্রকারভেদ যা আছে তা যথার্থ। কিন্তু এর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের জায়গায় মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। ২০০৩ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত বিশ্বে ইসলামী অর্থায়নের পরিমাণ পাঁচগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থা মুডিসের মতে, ইসলামী মূলধনকে দক্ষভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হলে এর পরিমাণ বর্তমানে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়াত। সেটি হয়নি বলেই বর্তমানে বিশ্ব অর্থ খাতের মাত্র পাঁচ শতাংশ রয়েছে ইসলামী পুঁজির আওতায়। চলতি বছরের মে মাসে এক সম্মেলনে বক্তারা বলেছিলেন, ৪০ বছরে ইসলামী পুঁজির পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন ডলার হয়েছে, কিন্তু এর দ্বিগুণ হতে মাত্র পাঁচ বছর সময় লাগবে। ১৯৭০ সাল থেকে ইসলামী অর্থ দর্শনে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বর্তমানে ৫০টিরও বেশি দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড রয়েছে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে বোমা হামলা ও তেলের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসলামী পুঁজির পরিমাণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। কারণ বেশির ভাগ মুসলিম বিনিয়োগকারীরা অর্থ ঘরে রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। গত মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থা (আইএমএফ) এমন মন্তব্যই করেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে মুডিসের এক প্রতিবেদনে ইসলামী আর্থিক খাতকে আরো সৃজনশীল হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ঝুঁকি কমাতে ও উন্নতি করতে হলে ইসলামী আর্থিক খাতে সৃজনশীলতার বিকল্প নেই। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ঝুঁকিমুক্তকরণের কৌশল ও নির্ধারকসমূহের সমন্বিত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ইসলামী পুঁজির সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব। আর এসবের দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমেই ঝুঁকিমুক্ত সেবা প্রদান করে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করাও সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে আমরিথ মুক্কামালা বলেন, ইসলামিক অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের আরো বেশি গতিশীল হওয়া উচিত। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা নতুন নতুন কৌশলে পরিচালনা করতে হবে। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে, ইসলামী পুঁজি ব্যক্তিক অর্থায়ন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ ব্যাংকিং খাতে প্রবেশের মাধ্যমে বিকশিত হতে পারে। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বমন্দায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবস্থান প্রথাগত ব্যাংকগুলোর তুলনায় বেশ ভালো ছিল। কিন্তু মন্দার কবল থেকে শেষ পর্যন্ত তারাও রক্ষা পায়নি। বিশেষত, প্রথাগত ব্যাংকগুলোর মতোই তারাও অনাদায়ী ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের আবাসন খাতের বিনিয়োগও লোকসান দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাখডার বলেন, ‘অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণ লোকসান দিলেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর মন্দা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং প্রথাগত ব্যাংকগুলোই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেক ইসলামী ব্যাংক এখনো দুরবস্থা কাটিয়েই উঠতে পারেনি।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামী পুঁজির নিয়মনীতির সামঞ্জস্য স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা প্রতিটি ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান শরিয়া বোর্ডের পরামর্শ মোতাবেক চলে এবং শরীয়া বোর্ডগুলো মূলত ইসলামী আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। বাখডারের মতে, ইসলামী পুঁজির পরিমাণ ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। তবে সেক্ষেত্রে স্বতন্ত্র ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় বিভিন্ন শীর্ষ ব্যাংকগুলোর ইসলামী ইউনিটের ভূমিকাই থাকবে বেশি।
বাংলাডেশে বর্তমানে সম্পূর্ণ ইসলামী ব্যাংক আছে ৮ টি :
১. ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড
২. আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক
৩. আইসিবি ইসলামী ব্যাংক (সাবেক ওরিয়েন্টাল ব্যাংক)
৪. সোশ্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক
৫. এক্সিম ব্যাংক অব বাংলাদেশ
৬. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
৭. শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক
৮. ফয়সল ইসলামী ব্যাংক
ইসলামী ব্যাংকিং এর শাখা আছে ৮ টি :
১. এবি ব্যাংক
২. সিটি ব্যাংক
৩. প্রাইম ব্যাংক
৪. সাউথ-ইস্ট ব্যাংক
৫. ঢাকা ব্যাংক
৬. প্রিমিয়ার ব্যাংক
৭. এইচএসবিসি
৮. আল-ফালাহ ইসলামী ব্যাংক
এছাড়া শাখায় সাধারণ ব্যাংকিং এর পাশপাশি ইসলামী ব্যাংকিং এর শাখা আছে তিনটির : ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড, ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক লিমিটেড । সাধারণ ব্যাংকিং এর তুলনায় অধিক মুনাফা অর্জনের সুযোগ থাকায় নতুনভাবে ইসলামী ব্যাংক স্থাপন ও চলমান সাধারন ব্যাংকসমূহের ইসলামীকরন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে ।

তাকাফুল (ইসলামী বীমা)
ইসলামী অর্থনীতিতে তাকাফুল হচ্ছে এক প্রকার বীমা পদ্ধতি, যেখানে বীমাকারী কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হলেবাকি সদস্যরা নির্ধারিত তহবিল থেকে সহায়তা করে থাকে। ইসলামী আইন ও শরীয়াহ ভিত্তিকভাবে পরিচালিত বীমা পদ্ধতির ইসলামী ব্র্যাড নাম হচ্ছে তাকাফুল। এই বীমা পদ্ধতিতে যে কোন ঝুঁকির ক্ষেত্রে একে অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে থাকে। তাকাফুল অন্যান্য বাণিজ্যিক বীমা প্রতিষ্ঠানের মতো একটি পণ্য হলেও এটি ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত।

সুকুক (ইসলামিক বন্ড)
ফিন্যান্সিয়াল সার্টিফিকেটের আরবি নাম হচ্ছে সাকুক, যা ইসলামিক বন্ড হিসেবে পরিচিত। ফিক্সড ইনকাম, সুদ ইত্যাদি ইসলামে বৈধ নয়। সুকুক হচ্ছে ইসলামী শরিয়াহ এবং বিনিয়োগ নীতিহমালায় প্রতিস্ঠানের জন্য নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা যেখানে সুদ নিষিদ্ধ।

ওয়াকালাহ
যখন কোন ব্যক্তি কাউকে লেন-দেন বিষয়ক প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করেন তখন এই বিষয়কে ওয়াকালাহবলে।

ওয়াদিয়াহ
ব্যাংক যখন কোন তহবিল গচ্ছিত রাখে কিংবা কেউ যখন ব্যাংকে কোন সঞ্চয় করে এবং ব্যাংক চুক্তি অনুযায়ী তা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করে বা গ্রাহকের চাহিদানুযায়ী ফেরত দেয় এই বিষয়টি ওয়াদিয়াহ হিসেবে পরিচিত।

– এযধৎধৎ, ওঋঝই, গঁৎধনধযধ, গঁংধধিসধয, জরনধ, ংযধৎরধ, ঝযরৎশধয, ঝঁশঁশ, ঞধশধভঁষ, তধশধঃ, মুদারাবা, মুশারাকা, মুরাবাহাহ
– মুদারাবা হিসাব
– মুশারাকা
– মুকাওয়া
– শিরকাতুল আনান
– শিরকাতুল উজুব
– ইজারা
– বাই-এ নাফিজ
– বাই-এ বাতিল
– বাই এ ফাসিদ
– বাই- এ মাওকুফ
– বাইমুয়াজ্জাল
– মুরাবাহা
– বাই সালাম

Comments

comments



One comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। Required fields are marked *

*

Scroll To Top