শিরোনাম

বুধবার, ডিসেম্বর 13, 2017 - পোক ফিচারটি ফিরিয়ে আনছে ফেসবুক | বুধবার, ডিসেম্বর 13, 2017 - গ্রামীণফোনের প্যানেল আলোচনায় ডিজিটাল চট্টগ্রামের রূপরেখা | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর 12, 2017 - দেশের সবচেয়ে বড় গেমিং প্লাটফর্ম ‘মাইপ্লে’ চালু করলো রবি | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর 12, 2017 - রাজধানীতে টেকনোর আরও নতুন দুইটি ব্র্যান্ড শপের শুভ উদ্বোধন | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর 12, 2017 - বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানীতে ল্যাপটপ মেলা | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর 12, 2017 - মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০তম | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর 12, 2017 - জরুরি সেবা ৯৯৯ এর উদ্বোধন করলেন জয় | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর 12, 2017 - নতুন অ্যাপ ‘ফাইলস গো’ চালু করেছে গুগল | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর 12, 2017 - বাজারে এলো শাওমির নতুন দুই ফোন | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর 12, 2017 - বিশ্ব বিখ্যাত পাঁচ রাঁধুনি রোবট |
প্রথম পাতা / অর্থনীতি / তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির গর্ব
তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির গর্ব

তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির গর্ব

বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে রপ্তানির মাধ্যমে ১,০২৬ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি আয় হয়েছিল প্রায় ৭২৮ কোটি ডলার। প্রবৃদ্ধি ৪১ শতাংশ।গত বছর বিশ্বের মাত্র ১২টি দেশ রফতানিতে প্রবৃদ্ধি অর্জনে সমর্থ হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ একটি এবং বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ। গত বছর বিশ্ব রপ্তানিতে ১২ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ ৪১ শতাংশ ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বরাবরের মতো গত ৬ মাসেও রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ এসেছে তৈরি পোশাক খাত তথা নিট ও ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে। বিশ্বব্যাপী যখন অর্থনৈতিক মন্দার লু-হাওয়া বইছে, বিশ্ব প্রবৃদ্ধি যখন নিম্নমুখী, বিশ্বের আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ যখন কমছে, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি তেলসহ জিনিসপত্রের দাম যখন বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ায় অনেক স্বল্পোন্নত দেশ যখন চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য আমদানির সাহস করছে না তখন বাংলাদেশ স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একটা স্বল্পোন্নত দেশের জন্য এ এক বিরল অর্জন। এর ফলে চলতি অর্থবছর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.৭ শতাংশ হবে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিয়েছেন। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিও বেশ স্থিতিশীল। বিশ্বে একমাত্র চীন ও ভারতই এর চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০১০ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি ১০.৩ শতাংশ এবং ভারতের প্রবৃদ্ধি ৯.৪ শতাংশ। তারপরও চীন ও ভারতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম।

13-lead_shokh_sarika
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে। মাত্র ৭ হাজার মার্কিন ডলার রপ্তানি হয়েছিল সে বছর। সাহসী উদ্যোক্তা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পরবর্তী দেড় দশকে খাতটির তেমন অগ্রগতি হয়নি। ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে আয় হয়েছে মাত্র ৬২ কোটি ডলার। ইতোমধ্যে প্রথম প্রজন্মের একদল নবীন উদ্যোক্তা এ খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। ফলে পরবর্তী ৫ বছরে রপ্তানি আয় কয়েক গুণ বাড়ে। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ২২৩ কোটিতে উন্নীত হয়। তারপর থেকে এ খাতকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। যদিও ১৯৯৩-৯৫ সময়ে জিএসপি জালিয়াতির কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জিএসপি সুবিধা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। ১৯৯৬-এর সরকার এর শান-িপূর্ণ সমাধান করে। তারপর থেকে প্রতি বছর ২০ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানি। গত অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১,২৫০ কোটি ডলার। চলতি ২০১০-১১ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন- প্রথম ৬ মাসে তৈরি পোশাক খাতে আয় হয়েছে ৭৯৫ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৫৫৯ কোটি ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪২.২ শতাংশ। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ১৯৯০-এর দশক পর্যন- গার্মেন্ট খাতের আয়ের সিংহভাগ আসত ওভেন পোশাক তথা শার্ট, ট্রাউজার, স্যুয়েটার প্রভৃতি থেকে। ১৮৯৭-৯৮ অর্থবছর থেকে নিট পোশাক তথা টি-শার্ট, আন্ডারগার্মেন্ট প্রভৃতি থেকে আয় বাড়তে থাকে। একসময় এ আয় ওভেন পোশাকের আয়কে ছাড়িয়ে যায়। গত অর্থবছরে নিট পোশাক থেকে আয় হয়েছে ৪৩১ কোটি ডলারের বেশি। আর ওভেন পোশাক থেকে এসেছে ৩৬৪ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের ৬ মাসে নিট পোশাক থেকে এসেছে ৪৩১ কোটি ডলার। আর ওভেন পোশাক থেকে এসেছে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার। নিট পোশাক তৈরিতে দেশীয় মূল্য সংযোজনের হার ওভেনের তুলনায় বেশি। তাই নিট পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি মানে দেশের অর্থনীতির জন্য আরো শুভসূচক।
১৯৯০-এর দশকে রপ্তানির বিপরীতে সরকারের ক্যাশ ইনসেনটিভ প্রদান এবং পরবর্তীতে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও আর্থিক প্রণোদনা, দেশীয় উদ্যোক্তাদের সাহসী উদ্যোগ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), ইইউসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের রপ্তানির পক্ষে নীতি প্রণয়নে সরকারের সফল দরকষাকষি সবকিছুই বাংলাদেশের পক্ষে গেছে। ২০০৫ সাল থেকে ইইউতে জিএসপি প্রথা চলে যাবে, বাংলাদেশ কম শুল্কে রপ্তানির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে, এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে যাবে এমন আশঙ্কাও পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ২০০৮ সালে মন্দা দেখা দেয়ার পর তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে যাবে এমনটাও অনেকে আশঙ্কা করেছিল। অবশ্য এ আশঙ্কা অমূলক ছিল না। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৯৪ শতাংশ হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউভুক্ত দেশগুলোতে। আর মন্দার প্রভাবও এসব দেশেই বেশি। বাস-বে বিপরীত ফলই এসেছে। দেশের প্রায় ৫ হাজার গার্মেন্ট কারখানায় কর্মরত প্রায় ৩০ লাখ শ্রমিক যাদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী তাদের জন্য এটি একটি বড় পাওয়া। এটি সরকারের জন্য স্বস্তির। ডব্লিউটিও’র তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বের দুই নম্বর গার্মেন্ট রপ্তানিকারক দেশ।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার। এসব দেশে ২০০৮ সাল থেকে মন্দা অব্যাহত থাকায় সহজেই ধরে নেয়া হয়েছিল বাংলাদেশের রপ্তানি কমবে। মন্দার কারণে সেসব দেশে চাহিদা কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি কমেনি। ২০০৯ সালে রপ্তানিসহ বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারগুলোতে দামি পোশাকের চাহিদা কমেছে। তাই চীন, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। জনগণের জীবনমান বৃদ্ধির ফলে এসব দেশে শ্রমের মজুরি বেড়ে গেছে। তাই তারা বেশি মূল্য সংযোজিত পোশাক যেমন জ্যাকেট, ব্লেজার, সু্যুট প্রভৃতি উৎপাদনে মন দেয়। শার্ট, টি-শার্ট, ট্রাউজার, আন্ডারগার্মেন্ট ইত্যাদিতে শ্রমিকের মজুরি দিয়ে তেমন লাভ হয় না দেখে গত ৫-৭ বছরে তারা এসব পোশাক উৎপাদন একরকম ছেড়েই দিয়েছে। মন্দার কারণে উন্নত দেশের ভোক্তারা এখন দামি পোশাকের পরিবর্তে সস্তা পোশাক কিনছে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট উৎপাদন ক্ষেত্রটি বড় বিধায় রফতানি বেশি হচ্ছে। এক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর মন্দা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণের পদক্ষেপগুলো থেকে কিছু কিছু ফল আসলেও এখনো বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তারপরও এ খাতের বিশ্ববাজারের মাত্র ৩ শতাংশ বাংলাদেশের দখলে। রপ্তানি বাড়ানোর বহু সুযোগ এখনো আছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ সাল থেকে আফ্রিকান গ্রোথ অ্যান্ড অপোরচুনিটি অ্যাক্ট-২০০০ অনুযায়ী আফ্রিকার প্রায় ৪০টি দেশকে এবং ক্যারিবিয়ান বেসিন ইকোনোমিক রিকোভেরি অ্যাক্ট-১৯৮৩ এর আওতায় প্রায় ২০টি ক্যারিবীয় দেশকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিচ্ছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ২০০৬ সালে ক্যারিবীয় দেশগুলো থেকে ২,৫০০ কোটি ডলার এবং আফ্রিকার দেশগুলো থেকে ৩,৬০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। যার মধ্যে তৈরি পোশাকও আছে। এর ফলে এ দুটি অঞ্চলের অনেক দেশ তৈরি পোশাক রপ্তানি বাজারে জোরালোভাবে আসতে শুরু করেছে। এসব দেশ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অন্য দেশের বাজারেও প্রবেশ করছে। বিভিন্ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায়নি। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশকে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দিনে দিনে এ প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং তা গোটা অঞ্চলেই বিস-ৃত হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত রপ্তানি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন বাজার সৃজনের দুর্বার চেষ্টা চালাতে হবে।
সার্ক মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভারত বাংলাদেশকে কিছু শর্তসাপেক্ষে শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা দেয়ার কথা। বহু আলোচনার পর ভারত ২০০৮ সাল থেকে বছরে ৮০ লাখ পিস তৈরি পোশাক শুল্কমুক্ত আমদানির কোটা বেঁধে দেয়। ভারতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জন্য বাংলাদেশ ২০০৮ ও ২০০৯ সালে নির্ধারিত কোটা পূরণ করতে পারেনি। ২০০৮ সালে নির্ধারিত কোটার ২৩ শতাংশ এবং ২০০৯ সালে ৩৭ শতাংশ পোশাক রপ্তানি করতে সমর্থ হয়েছে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ফলে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয়ে বড় বড় সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি কোটা অনুযায়ী তৈরি পোশাক রপ্তানির জটও খুলেছে। ২০১০ সালের পুরো কোটা অক্টোবর মাসের মধ্যেই রফতানি করা হয়েছে। ভারতের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কোটা নির্ধারণী আলোচনার সময় ভারত সম্মত হয়েছিল যে, বাংলাদেশ কোটা পূরণ করতে পারলে পর্যায়ক্রমে কোটা বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয়া হবে। এ অঙ্গীকার পূরণের জন্য দ্রুত আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। ভারতে এখন ২,৮০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাকের বাজার আছে এবং প্রতি বছর এ চাহিদা ১৮ শতাংশ করে বাড়ছে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নের সাথে সাথে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর পথও সুগম হতে পারে। দেশভিত্তিক রপ্তানি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং এবং ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল ও চিলিতে উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে।
সারণী অনুযায়ী প্রতিটি দেশেই রপ্তানি প্রতি বছর বাড়ছে। কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো প্রত্যেকেরই বাজার চাহিদা বেশি এবং প্রতি বছরই তা বাড়ছে। এসব দেশে ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস-ান প্রভৃতি দেশ প্রচুর রপ্তানি করছে। আমাদের দরকার এসব দেশের বাজার চাহিদা অনুধাবন করা। আমদানিকারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করা। তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাদের চাহিদা অনুযায়ী পোশাক তৈরি করা। এ জন্য রফতানিকারকদের তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে। এসব দেশে ঘন ঘন প্রতিনিধি দল পাঠাতে হবে। আলোচনা-দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আমদানিকারক তথা ভোক্তার চাহিদাকে মূল্য দিতে হবে। তাদের চাহিদামতো উৎপাদন করতে হবে। তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের বাজার সম্প্রসারণ প্রচেষ্টায় সরকারের উৎসাহ প্রদান প্রক্রিয়া আরো কার্যকর করতে হবে। মিশনগুলোকে আরো বাণিজ্যবান্ধব করে তুলতে হবে। তবেই তৈরি পোশাক রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের যে নবদুয়ার উন্মোচিত হয়েছে তা আরো বিস-ৃত ও চওড়া করা সম্ভব হবে। শ্রমঘন এ খাতটির প্রসার টেকসই করার জন্য অগ্রপশ্চাৎ সংযোগ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণসহ একটি জাতীয় পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। মনে রাখতে হবে, তৈরি পোশাক খাতের ওপর ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ
দু’সপ্তাহ আগে কলম্বোর দৈনিক সানডে টাইমস এ বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট একটি পিলে চমকানো খবর ছাপা হয়। পত্রিকার ব্যবসা-বাণিজ্য বিভাগে প্রকাশিত খরবটিতে বলা হয়, শ্রীলংকার পোশাক রপ্তানি আবারও বাড়ছে। আর এ রপ্তানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশ থেকে অনেক ক্রেতা ফিরে যাচ্ছে শ্রীলংকায় আর তারা বাড়তি অর্ডার দিচ্ছে বলেই বাড়ছে তাদের রপ্তানি। বেশ শঙ্কার খবর!
সানডে টাইমস’র একজন রিপোর্টারকে কথাগুলো বলেছেন শ্রীলংকা গার্মেন্ট বাইং অফিসেস এসোসিয়েশনের সভাপতি গোপাল আয়ার। আয়ার বলেছেন, বাংলাদেশে রায়ট হচ্ছে, সামাজিক সংঘাত চলছে, তাই ক্রেতারা বাংলাদেশ ছাড়ছেন। শ্রীলংকার প্রভাবশালী রপ্তানি সংগঠন, জয়েন্ট এ্যাপারেল এসোসিয়েশন ফোরামের (জেএএএফ) সভাপতি এ সুকুমারানও একই সুরে কথা বলেছেন সানডে টাইমসের সঙ্গে। খবরটিতে আরও বলা হয়, চীন থেকে সরে আসা কিছু ক্রেতাও আসছেন শ্রীলংকায় আর মিসরের রাজনৈত্যিক পরিস্থিতি খারাপ তাই সেখান থেকেও কিছু ক্রেতা সরে আসছেন।
খবরের যে অংশটি দেখলে অনেকেরই চোখ বড় হয়ে যাবে তা হলো, বাংলাদেশে রায়ট আর চরম সামাজিক সংঘাত চলছে। বাংলাদেশে কি আসলেই রায়ট হচ্ছে? সামাজিক সংঘাত কি চরমে? ক্রেতারা এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরিস্থিতি হয়ে গেছে?
বাংলাদেশে অবস্থানকারী যে কোনো বিদেশিই খবরটি পড়লে ভিমড়ি খাবেন। তবে বাস-বতা হলো, খবরটি ছাপা হয়ে গেছে আর ইন্টারনেটের কল্যাণে ইংরেজি ভাষায় লেখা এ খবরটি বিশ্বজুড়ে ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ নেগেটিভ আর প্যানিকি নিউজের জন্য বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত প্রিয় স্পট। ঘটনা সাধারণ হলেও সেটিকে আমাদের মিডিয়ায় প্যানিকি করে উপস্থাপনা করাটা আমাদের খবর সংস্কৃতি। এখানেই সূত্র খোঁজ পায় বিদেশি মিডিয়া আর বাংলাদেশের রপ্তানিকারক প্রতিযোগীদের সংগঠনগুলোর নেতারা এগুলো কৌশলে ব্যবহার করেন অনেকটা মিথ্যাচারের মতো।
হয়তো দু’সপ্তাহ আগে ঘটা আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দরের বিরুদ্ধে স্থানীয় গণবিক্ষোভকেই ভাবা হয়েছে রায়ট হিসেবে। আড়িয়াল খুবই গণতান্ত্রিক একটি গণপ্রতিরোধ ছিল গণতান্ত্রিক সরকারেরই অগণতান্ত্রিকভাবে নেয়া একটি উন্নয়ন উদ্যোগের বিরুদ্ধে। যেহেতু আমাদের গণমাধ্যমে ঘটনাটি রায়টের মতো করে উপস্থাপন করা হয়েছে তাই বিদেশি মিডিয়াও সেটি সেভাবেই অনুবাদ করেছে। বাংলাদেশের প্রতিযোগী রপ্তানিকারকরা তার যুৎসই ব্যবহার করেছে মাত্র। কিন্তু কেনই বা এমনটি করল শ্রীলংকানরা? উত্তরটি খুবই সাধারণ। যে কোনোভাবেই বাংলাদেশ থেকে যদি কিছু ক্রেতা শ্রীলংকায় যায় তবে তাতে তাদের তো লাভই। চীনে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকটে তাদের স্বল্পমূল্য পোশাক রপ্তানি খাতের দুরাবস্থায় সবচে বেশি লাভবান হয়েছে আপাতভাবে বাংলাদেশ। ক্রেতা উপচে পড়েছে এদেশে। যত অর্ডার এখন আমাদের রপ্তানিকারকদের আশপাশে ঘুরঘুর করছে তা সব নেয়া সম্ভব নয়। ঠিক এ সময়ই গৃহযুদ্ধ শেষে শ্রীলংকা নতুন একটি বন্দর চালুসহ অবকাঠামোর নানা উন্নয়ন করে অপেক্ষা করছে বিদেশি পোশাক আমদানিকারকদের। এখন তাদের সরকার ও বেসরকারি খাতের নেতারা প্রচারণায় নেমেছেন শ্রীলংকার উন্নত অবকাঠামো আর শর্ট লিড টাইম নিয়ে।
একসময় শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধ বাংলাদেশে ক্রেতাদের টেনে এনছিল। সেই শ্রীলংকানরাই চাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে ক্রেতা টেনে নিতে? হ্যাঁ এটিই রুলস অব দ্যা গেম। নাগরিকদের অধিক কর্মসংস্থান, অর্থনীতি উন্নয়ন এসবই রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে প্রতিযোগিতার বিষয় এখন। কারও পাড় ভাঙবে তো কারও পাড় গড়বে।
বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাক বিশ্ব পোশাক বাজারে তা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী অনেক পোশাক রপ্তানিকারক দেশ নাও চাইতে পারে। প্রকাশ্যে বা পর্দার আড়ালে প্রচারণা চালিয়ে যদি এদেশ থেকে অন-ত কিছু ক্রেতাও ভাগিয়ে নেয়া যায় তাতে তাদের লাভই বটে।
১৫ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয়, এ খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান ৩০ লাখেরও বেশি শ্রমিকের। রপ্তানিকারকরা ২৫-৩০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন বছর তিনেকের মধ্যেই। এমন একটি দেশকে কেনই বা ঈর্ষা করবে না অন্যরা?
দু’সপ্তাহ গত হলো আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন কোথাও থেকে প্রতিবাদ হয়নি সানডে টাইমসের খরবটির বিরুদ্ধে। দায়িত্বশীলদের অনেকেই হয়ত খবরটি পড়েনই নি। এমন খবরগুলোর খবর রাখতেই হবে লাখো কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া রপ্তানি শিল্পের স্বার্থে, লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান অটুট রাখার স্বার্থে।
পুনশ্চ, শ্রীলংকার শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক ব্রান্ডিক্স গ্রুপের কর্তা আশরাফ ওমর এ লেখককে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে ক্রেতা শ্রীলংকায় যাচ্ছেন এটি আসলে ভুল বর্ণনা। কয়েক মাস আগে ইইউ-জিএসপি জটিলতা ও অন্য কারণে শ্রীলংকার সঙ্গে অনেকদিন ধরে ব্যবসা করেন এমন কিছু পশ্চিমা ক্রেতা বাংলাদেশে এসেছিলেন অর্ডার দিতে। বাংলাদেশে ফ্যাক্টরিগুলো অতিব্যস্ত থাকায় তারাই আবার শ্রীলংকায় ফিরে যাচ্ছেন।

Comments

comments



মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। Required fields are marked *

*

Scroll To Top