শিরোনাম

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী 18, 2018 - ওয়ান প্লাসের নতুন পাওয়ার ব্যাংক | বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী 18, 2018 - স্প্যাম মেসেজ ঠেকাতে হোয়াটসঅ্যাপের নতুন ফিচার | বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী 18, 2018 - যাত্রা শুরু করলো ওয়ালটনের কম্পিউটার কারখানা | বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী 18, 2018 - নতুন স্মার্টফোন আনল হুয়াওয়ে অনার | বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী 18, 2018 - স্বল্প মূল্যের গ্যালাক্সি সিরিজের ফোন ‘অন৭ প্রাইম’ | বুধবার, জানুয়ারী 17, 2018 - একত্রে কাজ করবে এটুআই এবং একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প | বুধবার, জানুয়ারী 17, 2018 - ল্যাপটপের সঙ্গে রাউটার ফ্রি! | বুধবার, জানুয়ারী 17, 2018 - ‘অপো এশিয়ায় সর্বাধিক বিক্রীত স্মার্টফোন’ | বুধবার, জানুয়ারী 17, 2018 - চীনে চালু হচ্ছে গুগলের এআই ল্যাব | বুধবার, জানুয়ারী 17, 2018 - বৈদ্যুতিক গাড়িতে ১১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগে ফোর্ডের আগ্রহ প্রকাশ |
প্রথম পাতা / স্থানীয় খবর / মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম: সারাদেশে ২৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ অকেজো
মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম: সারাদেশে ২৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ অকেজো

মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম: সারাদেশে ২৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ অকেজো

মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, শুনতেই ভালো লাগে। আমাদের দেশেও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের প্রচলন শুরু হয়েছে। তবে কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তুষ্টি রয়েই গেছে। সরেজমিনে দেখা যায় বিভিন্ন জায়গায় মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামাদি অপ্রতুলতাও অসন্তুষ্টির কারণ।

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বিষ্ণুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্লাসে এত ছাত্রছাত্রী যে তাদের একসঙ্গে বসিয়ে ডিজিটাল ক্লাস নেয়ার সুযোগই নেই। তাই আইটি শিক্ষক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালানোর বিষয়ে দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ নিয়ে এলেও তিনি ছাত্রছাত্রীদের তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানাতে পারছেন না। সরকারের পক্ষ থেকে ওই স্কুলে একটি ল্যাপটপ, একটি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, একটি স্পিকার, একটি ইন্টারনেট মডেম (সিমসহ) দেয়া হয়েছে। সেগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

multimedia

দ্বীপ-জেলা ভোলার সদর উপজেলার চরনোয়াবাদ মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী বলে, ‘প্রজেক্টরের মাধ্যমে ক্লাস হলে ভালো শিখতে পারি। কিন্তু বেশির ভাগ সময় ল্যাপটপ নষ্ট থাকে, তাই প্রজেক্টরও বন্ধ থাকে। ভালোমতো ক্লাস করতে পারি না।’ আরেক শিক্ষার্থী বলে, ‘আমরা থিওরি ক্লাসগুলো করতে পারলেও কম্পিউটার সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে পারছি না।’ স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু তাহের বলেন, ‘কম্পিউটার নষ্ট হয়ে গেলে মেরামত করতে অনেক টাকা লাগে। স্কুলের পক্ষে বারবার মেরামত করা সম্ভব হয় না। নানা কারিগরি জটিলতা ও বাজেট স্বল্পতার কারণে কম্পিউটার ক্লাস নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

শুধু ফেনীর বিষ্ণুপুর আর ভোলার চরনোয়াবাদ স্কুলই নয়, সারা দেশে ২০ হাজারেরও বেশি স্কুলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাদানের জন্য সরকার ৩০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ২০১১ সালে প্রকল্পের শুরু, মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে কম্পিউটার ও সরঞ্জামাদি মেরামতের পরিপত্র জারি করে সরকার এ প্রকল্পের ইতি টানতে যাচ্ছে।

গত ৮ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রকল্পের সর্বশেষ সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, মূল প্রকল্প শেষ হলেও ২০১১ সালের পর সারা দেশে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ায় সরকার আরো দুই হাজার ৮৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইটি শিক্ষা ক্লাসের জন্য মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামাদি পাঠানোর বন্দোবস্ত করতে যাচ্ছে। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি প্রায়োগিক শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের নিবিষ্ট করতে ও আইটি শিক্ষায় পারদর্শী করে তুলতে সরকার ২০১১ সালে ৩০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন’ প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ২০ হাজার ৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, স্পিকার ও ইন্টারনেট মডেম (সিমসহ) বিতরণ করা হয়েছে। ডিজিটাল কন্টেন্ট ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে ১৯ হাজার ২৬২ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পের আইটি সরঞ্জামাদির মধ্যে ল্যাপটপ সরবরাহ করেছে টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস), সিমসহ মডেম সরবরাহ করেছে গ্রামীণফোন, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সরবরাহ করেছে ফ্লোরা লিমিটেড ও স্মার্ট টেকনোলজি। সরকারের সরবরাহ আদেশ অনুযায়ী, টেশিস সারা দেশে তাদের সরবরাহ করা ল্যাপটপের জন্য তিন বছর পর্যন্ত বিক্রয়োত্তর সেবা দেবে।

অনেক স্কুলের শিক্ষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে আইটিসামগ্রী দেওয়া হলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এ কারণে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও আগ্রহী শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও এ প্রকল্পে সফলতা আসছে না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বেশির ভাগ কম্পিউটারের ব্যাটারি ডাউন, প্রসেসর নিম্নমানের, হার্ডডিস্ক ও মাদারবোর্ড দুর্বল, র‌্যামের গতি কম। নানা সমস্যার কারণে এগুলো চালানো যাচ্ছে না। আবার অনেক স্কুলে আইটিসামগ্রী ঠিক থাকলেও বিদ্যুৎ থাকে না। আবার বিদ্যুৎ থাকলেও লো ভোল্টেজের কারণে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চালানো সম্ভব হয় না।

বিভিন্ন স্কুল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সমস্যাগুলো হচ্ছে, স্কুল সময়ে ক্লাসরুমে বিদ্যুৎ না থাকা, শিক্ষার্থীর তুলনায় ক্লাসরুম ছোট, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কন্টেন্ট তৈরি করে শিক্ষার্থীদের দেখাতে না পারা প্রভৃতি। এসব সমস্যার কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারের ডিজিটাল ক্লাসরুম প্রকল্পের সাফল্য অধরাই থেকে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে প্রকল্পের উল্লিখিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। ৩০৩ কোটি টাকার মতো খরচও হয়ে গেছে। অবশ্য অসম্পন্ন কিছু কাজ শেষ করার জন্য মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়ে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সভায় ল্যাপটপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান টেশিসের বিল থেকে কেটে নেওয়া পাঁচ কোটি ৪৬ লাখ ৫৯ হাজার ৬৬২ টাকা টেশিসকে ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, তদারকি না থাকায় বেশির ভাগ স্কুলেই ঠিকমতো ব্যবহার করা হচ্ছে না ডিজিটাল ক্লাসরুম। আড়াই হাজার ক্লাসরুম অচল পড়ে আছে। শিক্ষার্থীরা এসবের সুফল পাচ্ছে না। অনেক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ ও মডেম ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন প্রধান শিক্ষক বা গভর্নিং বডির সদস্যরা। বাকি সরঞ্জাম প্যাকেটবন্দি হয়ে পড়ে আছে। অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানেই না যে তাদের স্কুলে মাল্টিমিডিয়া সিস্টেম রয়েছে।

গত ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম থেকে ই-লার্নিং স্পেশালিস্ট প্রফেসর ফারুক আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তাতে বলা হয়েছে, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম অনেক বিদ্যালয়েই ঠিকমতো চালু নেই। শিক্ষকদের মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট ডেভেলপমেন্ট কার্যক্রম তেমন নেই। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখন-শেখানো কার্যক্রমের গুণগত মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

এ অভিযোগের ব্যাপারে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, ‘এটুআই প্রকল্প থেকে চিঠি দেওয়ার পর আমরা সব জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে তদারকি ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের ব্যবহার নিশ্চিত করতে বলেছি। তবে আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, যতটা বলা হচ্ছে বাস্তবে অবস্থা ততটা খারাপ নয়।’

সারা দেশে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ অকেজো হয়ে আছে। তাহলে কেন ল্যাপটপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে- জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, সারা দেশে নষ্ট ল্যাপটপের সংখ্যা ৭০০-এর মতো। এগুলো মেরামত করে দিলে টেশিসকে টাকা ফেরত দেয়া হবে মর্মে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সরকার আরো ছয় মাস মেয়াদ বাড়িয়েছে। শেষ হবে আগামী ডিসেম্বরে।’

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্কুলগুলো এসব মূল্যবান আইটিসামগ্রী কিভাবে ব্যবহার করবে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘পরে স্কুলগুলো তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালাবে। এ বিষয়ে কয়েক মাস আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র জারি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়গুলো নিজস্ব খরচে আইটিসামগ্রী সংস্কার ও পরিচালনা করবে।’ এছাড়া বিদ্যুতের বিকল্প উৎসের কথা সরকার চিন্তা করছে বলে জানান তিনি। কিন্তু কবে নাগাদ সরকারের সেই চিন্তার সুফল পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের কার্যকারিতা দেখতে গত জুনে ১১টি স্কুল পরিদর্শন করে। তাদের প্রতিবেদনে ক্লাসরুমের অনিয়মিত ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

ভোলা কম্পিউটার শিক্ষক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার পারভেজ বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিম্ন মানের কম্পিউটার সরবরাহ করায় আমরা ভোগান্তির শিকার হয়েছি। শহরে নামমাত্র থ্রিজি সুবিধা পাওয়া গেলেও গ্রাম এলাকায় এখনো নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখেছি, অনেক স্কুলের কম্পিউটার ত্রুটিপূর্ণ। এগুলোকে সচল করার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বরাদ্দ পাচ্ছে না। স্থানীয়ভাবে দু-একবার মেরামত করা হলেও বেশির ভাগ সময় অকেজো অবস্থায় ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছে স্কুলগুলো।’

মাল্টিমিডিয়া কার্যক্রমে বিভাগ হিসাবে রাজশাহীর অবস্থা করুণ। এরপর রয়েছে বরিশাল বিভাগ। এ বিভাগের ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার অবস্থা খারাপ। এরপরের অবস্থানে রংপুর বিভাগ। এ বিভাগের গাইবান্ধা ও নীলফামারী জেলার চিত্র হতাশাজনক। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার অবস্থাও ভালো নয়।

দুঃখজনক হলেও উপরের চিত্রগুলো সত্য। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালুর সিদ্ধান্ত নিলেও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক জায়াগায়ই মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের ব্যবহার তেমন একটা দেখা যায় না। উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে সরকার বহুমূখী পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে ঠিক কবে নাগাদ সব সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হবে, সে ব্যাপারটি অনেকটাই অনিশ্চিত।

Comments

comments



মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। Required fields are marked *

*

Scroll To Top