ঢাকা | মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮ |
২৮ °সে
|
বাংলা কনভার্টার

ডিজিটাল কমার্স খাতে শৃঙ্খলা আর গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে করনীয়

ডিজিটাল কমার্স খাতে শৃঙ্খলা আর গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে করনীয়
লেখক :সভাপতি, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সাভির্সেস (বেসিস)

করোনা মহামারী চলাকালে বিশেষ করে লকডাউনের সময়ে ডিজিটাল কমার্স বা অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয়ের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যাঁরা কোনদিন ইন্টারনেটে কেনাকাটার কথা কখনও চিন্তা করেননি, তাঁরাও এ সময়ে ডিজিটাল কমার্স ব্যবহার করেছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, খাদ্যপণ্য, ঔষধপত্র ইত্যাদি অনলাইনে কেনার একটা অভ্যেস তৈরী হয়েছে জনগণের। যেকোন ব্যবসায়েই গ্রাহক অধিগ্রহণ একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই দুঃসময়ে নতুন ভোক্তা তৈরী হওয়াটা যেন শাপে বর হয়েছে ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ে! ভোক্তাদের এই অনলাইনে কেনাকাটার ধারা যে ভবিষ্যতে শুধু চলমান থাকবে তা’ নয়, বরং প্রসারিতও হবে। অর্থাৎ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি অন্যান্য দ্রব্যাদি, টুকিটাকি ইত্যাদি কেনার চলও শুরু হবে। তাই ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ের জন্য বর্তমান সময়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ে দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে কর্মসস্থান সৃষ্টি করা এবং একই সাথে ভোক্তার আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং এই ডিজিটাল ব্যবসায়ে শৃঙ্খলা আনার উদ্দেশ্য নিয়ে ‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১’ জারি করা হয়েছে। এর ফলে যে শুধু প্রতিযোগিতামূলক বাজারই সৃষ্টি হবে তা’ না, একই সাথে নতুন উদ্যোক্তাও তৈরী হবে। ডিজিটাল কমার্স ব্যবসার পরিবেশকে অনুকূল করে এই ক্ষেত্রের প্রসারেও এই নির্দেশিকা একটা বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো ভোক্তার আস্থা অর্জন করা। আর ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারলেই এই আস্থা অর্জন সম্ভব। যেসব পদক্ষেপ নিলে ভোক্তা-অধিকার নিশ্চিত করা যেতে পারে, তা’র মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওয়েবসাইটে পণ্য বা পরিষেবার সঠিক বিবরণ এবং শর্তাবলী সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত রাখা। একই সাথে পণ্য ও মূল্য ফেরৎ, পরিবর্তন ও সরবরাহের সময়সীমা ইত্যাদি বিষয়াদির উপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এসব বিষয় এই নির্দেশিকায় পরিষ্কারভাবে বর্ণিত আছে।

ডিজিটাল কমার্স ব্যবহার করে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (MLM) বা নেটওয়ার্ক ব্যবসা করার একটা প্রবণতা দেখা গেছে ইদানিং। এই ধরণের পদ্ধতি বা স্কীমগুলো সাধারণতঃ খুব আকর্ষণীয় হয়ে থাকে, যাতে প্রচুর সংখ্যক গ্রাহক এর সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং এতে বিনিয়োগ করা শুরু করে। অনেকটা জুয়া খেলার মত বিনিয়োগকারীরা টাকা ঢালতেই থাকে; কিন্তু বেশীভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরণের ব্যবসায়ের পরিণতি খুব একটা আশানুরূপ হয়না বিনিয়োগকারীদের জন্য। এই মডেল ডিজিটাল কমার্সের বেলায় ব্যবহৃত হতে থাকলে কোন না কোন সময়ে গ্রাহকরা প্রতারিত হবে এবং তা’র প্রভাব পুরো ইণ্ডাস্ট্রির উপর পড়বে। ফলশ্রুতিতে গ্রাহকের আস্থা হারিয়ে ডিজিটাল কমার্স ইণ্ডাস্ট্রি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে। তাই এই মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং বা নেটওয়ার্ক পদ্ধতিতে ডিজিটাল কমার্স ব্যবসার বিরুদ্ধে নিশেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এই নির্দেশিকায়।

ডিজিটাল বাংলাদেশে তথ্যের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা এখন অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়। গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য যেমন নাম, জন্ম-তারিখ, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ইত্যাদি কী কী তথ্য সংগ্রহ করা হবে, কোথায় সেই তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং কোথায় তা’ ব্যবহৃত হবে, এসবের পূর্বানুমতি গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে এই নির্দেশনায়। সরকারের আইসিটি বিভাগ ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার এণ্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) যে ডাটা প্রাইভেসি নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে, তা’র সাথে এ বিষয়ে সামঞ্জস্য থাকা একান্ত প্রয়োজন।

লটারীর প্রলোভন দেখিয়ে কোন ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ী যাতে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত বা প্রতারিত না করতে পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। তবে বিপণনের প্রয়োজনে মাঝে মাঝে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের অনুমতি সাপেক্ষে এ ধরণের বিশেষ ব্যবস্থা থাকতেই পারে। সেক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। গিফ্‌ট বা ক্যাশ ভাউচার ইস্যু বা বিক্রী করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে এখন থেকে। তবে এ বিষয়ে এই নির্দেশনায় সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা নেই। গিফ্‌ট বা ক্যাশ ভাউচার সারা পৃথিবীতেই বেশ জনপ্রিয়। অনেকেই এই ভাউচার ক্রয় করে উপহার হিসেবে দিয়ে থাকেন প্রিয়জনদের। এই ভাউচারগুলো যেহেতু প্রি-পেড, তাই বিক্রেতারাও তা’দের রেভেনিউ আয় বাড়াতে এই ভাউচার বিক্রীকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এধরণের ব্যবসা পরিচালনা, মার্কেটিং কার্যক্রম বা সেল্‌স প্রমোশন ইত্যাদি কাজে যদি কথায় কথায় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়, তা’হলে ব্যবসা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। তাই ভাউচার ইস্যু করার ক্ষেত্রে কোন জটিলতা থাকাটা অবাঞ্ছনীয়। তবে গ্রাহক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ভাউচারগুলোর মূল্যমান লিখিত মূল্যের সমান রাখার বিধান করা যেতে পারে।

ডিজিটাল কমার্সের ছদ্মবেশে অর্থ ব্যবসা করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এই নির্দেশিকায়। বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের অনুমতি ব্যাতিরেকে কেউ ডিজিটাল ওয়ালেট বা ব্যাঙ্কিং জাতীয় কোন কার্যকলাপ চালাতে পারবে না এই নির্দেশনা অনুযায়ী। তবে লয়েলটি কার্ডের ব্যাপারে কিছু বলা নেই এখানে। বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান তা’দের গ্রাহকদের আনুগত্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এক ধরণের কার্ড বা পয়েন্ট সিস্টেম চালু করে থাকেন। গ্রাহক কেনাকাটা করলে সেই লয়েলটি কার্ডে পয়েন্ট জমা হয় এবং পরে তিনি এই পয়েন্ট ব্যবহার করে দাম পরিশোধ করতে পারেন। কোন ক্ষেত্রে এই পয়েন্ট অন্য কোন সহযোগী দোকানে বা ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানেও ব্যবহার করা যায়। তাই যেহেতু এই লয়েলটি কার্ডগুলো অর্থের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে, সেহেতু এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের অনুমোদন লাগবে কিনা তা’ স্পষ্ট করা দরকার।

ক্রেতাকে কোনভাবে পণ্য বা পরিষেবা ক্রয়ে বাধ্য করতে পারবে না ডিজিটাল কমার্স ব্যবাসায়ীরা। ভোক্তা অধিকারের দিক থেকে এই নির্দেশনা ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু ক্রেতা যদি কোন অর্ডারি বা কাস্টম-মেড পণ্য ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে, কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরে তা’ ক্রয়ে অস্বীকৃতি জানায়, তখন বিক্রেতার জন্য এর প্রতিকার বা নিষ্পত্তির কী উপায় থাকবে, সে বিষয়েও কিছু দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

সচ্ছতার এবং সম্ভাব্য পরবর্তী তদন্তের জন্য ব্যবসায়ে লেনদেন সংক্রান্ত সকল তথ্যাদি অন্ততঃপক্ষে ৬ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করার বিধান রাখা হয়েছে এই নির্দেশিকায়। তদন্তের জন্য যত বেশী তথ্য পাওয়া যায়, তত ভাল কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এত তথ্য রাখার জন্য যে স্টোরেজ স্পেস দরকার হবে, তা’ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সামর্থে কুলাবে কিনা ভাববার বিষয়। তা’ছাড়া এতদিন ধরে গ্রাহকের তথ্য রেখে দেওয়াটা ডাটা প্রাইভেসী গাইডলাইনের পরিপন্থী হবে কিনা, সে’টাও দেখতে হবে।

এই নির্দেশিকার ফলে কোন মার্কেটপ্লেস মূল বিক্রেতার পাওনা টাকা ১০ দিনের বেশী ধরে রাখতে পারবে না, যদি না উভয়ের মধ্যে অন্য কোন রকম চুক্তি থেকে থাকে। এছাড়াও মূল বিক্রেতার নাম, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন নম্বর, ঠিকানা ইত্যাদি মার্কেটপ্লেস কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত থাকতে হবে।

ডিজিটাল কমার্স ওয়েবপেজে বা ফেসবুক পেজে ক্রয়-বিক্রয়, মূল্য-ফেরৎ, পণ্য পরিবর্তন বা ফেরৎ, ডেলিভারী পদ্ধতি ও সময় সহ সকল শর্তাবলী আবশ্যিকভাবে বাঙলায় ও প্রয়োজনে অন্য ভাষায় লিপিবদ্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এইসব শর্তাবলী যাতে প্রচলিত আইন বা বিধির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, সেদিকেও মনোযোগী হতে হবে। এই শর্তাবলী গ্রাহক মেনে নিল কিনা সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা জরুরী। কিছু কিছু ওয়েবসাইট ‘ব্রাউজ র‍্যাপ’ পদ্ধতিতে এই সম্মতি নিয়ে থাকে, অর্থাৎ গ্রাহক ঐ ওয়েবপেজ দেখা বা ব্রাউজ করা মানেই হলো তা’র ঐ পেজে লিখিত শর্তাবলীর প্রতি সমর্থন রয়েছে। এধরণের ‘সম্মতি’ প্রদান ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়, কারণ আমাদের দেশে গ্রাহকরা এখনও সচেতন হয়ে ওঠেননি। তাই সকল সম্মতি ‘ক্লিক র‍্যাপ’ পদ্ধতিতে নেওয়ার বিধান রেখে চেকবক্সের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে গ্রাহক পেজের কোন নির্দিষ্ট স্থানে ক্লিক করে তা’র সম্মতি প্রদান করবেন।

ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১-এ বলা হয়েছে, বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে ব্যবসা করতে হলে অবশ্যই এদেশে নিবন্ধিত হতে হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অন্নুমোদন গ্রহণ করতে হবে। এই নির্দেশনাটির ব্যাপারে যথেষ্ট স্পষ্টিকরণ প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রচুর গ্রাহক বৈধভাবে বিভিন্ন বিদেশী ডিজিটাল কমার্স প্ল্যাটফর্মের পরিষেবা গ্রহণ করে থাকেন। এর মধ্যে হোটেল বুকিং, এয়ার-টিকেটিং ইত্যাদি অন্যতম। এই নির্দেশনার ফলে এসব বিদেশী ডিজিটাল কমার্স প্ল্যাটফর্ম এদেশে পরিষেবা দিতে পারবে না, যদি না তা’রা বাংলাদেশে নিবন্ধিত হয়। এতে বাংলাদেশের গ্রাহকরা গ্লোবাল কানেক্টিভিটি হারাবেন। তাই কোন বিদেশী প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র তা’দের পণ্য বা সেবা দেশীয় কোন মার্কেট-প্লেসের মাধ্যমে বিক্রয় করতে চাইলেই নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রাখা যেতে পারে। এ বিষয়ে নির্দেশনাটি সংশোধন করা প্রয়োজন।

ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ী ঘোষিত মূল্যের চাইতে অধিক দাবী করতে পারবে না বলে বিধান রাখা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে শুধু মার্কেটপ্লেসের কথা বলা হয়েছে। বিধানটি সকল ডিজিটাল কমার্স প্ল্যাটফর্মের জন্যই প্রযোজ্য হয়া উচিৎ।

পরিচালনা নির্দেশিকায় মেধাস্বত্ব যথাযথভাবে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নকল পণ্য পরিবেশন করলে গ্রাহকের বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করার সম্ভাবনা থাকে। মেধাস্বত্ব আইন এদেশে বলবৎ থাকলেও এর প্রয়োগের অভাবে এই আইনের যথেচ্ছ বরখেলাপ হচ্ছে। অনেকে জাল বা নকল পণ্যকে ‘রেপ্লিকা’ হিসাবে চিহ্নিত করে খোলাখুলি ভাবেই বিপণন করে যাচ্ছে।

ভেজাল পণ্য প্রদর্শন না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তবে এক্ষেত্রে দায় মার্কেটপ্লেস না বিক্রেতা নাকি উৎপাদনকারী বা আমদানীকারক কার উপর বর্তাবে, তা’ বলা হয়নি। যদিও নির্দেশনায় বলা আছে, মার্কেটপ্লেসের সাথে বিক্রেতার ভিন্নতর চুক্তি থাকলে সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, তথাপি মার্কেটপ্লেসে কোন জাল, নকল বা ভেজাল পণ্য পরিবেশিত বা বিক্রিত হলে গ্রাহকের অভিযোগ মার্কেটপ্লেসকেই সমাধান করতে হবে, এই মর্মেই নির্দেশনা থাকা উচিৎ। অর্থাৎ, ক্রেতা যার কাছ থেকে পণ্যটি কিনবেন বা যাকে মূল্য পরিশোধ করবেন, তা’কেই এর প্রতিকার এবং নিষ্পত্তি করতে হবে।

৪৮ ঘন্টার মধ্যে যে সকল পণ্যের ডেলিভারী প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে না, সে সকল পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যের ১০%-এর বেশী আগাম নেওয়া যাবে না। যদিও আসন্ন এস্‌ক্রো সার্ভিসের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মূল্যই গ্রহণ করা যাবে। এই বিষয়টি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের কথা মাথায় রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে; কিন্তু ব্যবসায়ের ক্যাশ-ফ্লোর কথা চিন্তা করে এই অগ্রীমের পরিমাণ ডেলিভারী সময়ের সাপেক্ষে নিরুপণ করা যেতে পারে। যেমন, ডেলিভারী যদি ১ মাসের মধ্যে হয়, তবে ৫০%; ২ মাসের মধ্যে হলে ৩০%; ৩ মাসে হলে ২০% এবং এর অধিক হলে ১০%। অনেকক্ষেত্রে, উৎপাদনকারী একটা যথেষ্ট পরিমাণ ডাউন পেমেন্ট ছাড়া উৎপাদন শুরু করে না। বিশেষ করে অর্ডারি বা কাস্টম-মেড পণ্যের বেলায় কেবল ১০% অগ্রীম নেওয়াটা ব্যবসায়ীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

পণ্যের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধিত হলে ক্রেতা ও বিক্রেতা একই শহরে অবস্থান করলে সর্বোচ্চ ৫ দিন এনং ভিন্ন শহরে অবস্থান করলে সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে পণ্য ডেলিভারী প্রদান করতে হবে। সেবার মান নিশ্চিত করা ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের দিক থেকে নিঃসন্দেহে এটি একটি ভাল উদ্যোগ। তবে, ডেলিভারী প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি বা গাফিলতিতে দায় ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানের উপর দেওয়া ঠিক হবে না। তাই নির্দেশনায় কিছুটা সংশোধন এনে ‘ডেলিভারী প্রদান করতে হবে’-এর পরিবর্তে ‘ডেলিভারীম্যান বা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করতে হবে’ বলাটা যুক্তিযুক্ত হবে। একই সাথে ৫ দিন ও ১০ দিনের সময়সীমাকে কর্মদিবসে হিসাব করতে হবে।

সময়মত ডেলিভারী ও পণ্যের সুরক্ষার জন্য বিক্রেতা বা মার্কেটপ্লেসের সাথে ডেলিভারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তি ও প্রয়োজনে ইনস্যুরেন্স রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তির ক্ষেত্রে গ্রাহককে সর্বোচ্চ অধিকার দেওয়া বাঞ্ছনীয় এবং ইনস্যুরেন্সের খরচ গ্রাহক নয়, বরং ডেলিভারী প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তানোর বিধান থাকা প্রয়োজন।

প্রতিটি ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানে একজন কমপ্লায়েন্স অফিসার নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যিনি ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর ও অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধন করবেন। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই বিধান প্রতিপালন করা যথেষ্ট ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য হবে। তাই এটিকে বাধ্যতামূলক না করে উৎসাহিত করা যেতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানের একজনকে এই সকল দপ্তর ও সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধনের জন্য মনোনীত করার বিধান থাকতে পারে। নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণে পণ্য বা সেবা প্রদান সম্ভব না হলে সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ক্রেতাকে তৎসম্মন্ধে অবহিত করার এবং ৭২ ঘন্টার মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ ফেরৎ প্রদান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে, ৭২ ঘন্টার মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ ফেরৎ প্রদানের পরিবর্তে ফেরৎ প্রক্রিয়া শুরু করার বাধ্যবাধকতা রাখা উচিৎ। কারণ, বেশীভাগ সময়েই পেমেন্ট গেটওয়ে, ব্যাঙ্ক, পেমেন্ট এগ্রিগেটর ইত্যাদির অর্থ ফেরৎ প্রক্রিয়া শেষ হতে ৭ বা ততোধিক কর্মদিবস লেগে যায়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হবে।

বিক্রেতা কোন কারণে পণ্য বা সেবা সরবরাহ করতে সক্ষম না হলে পরিশোধিত মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ ক্রেতাকে ফেরৎ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য বা আস্থা বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘বিফলে দ্বিগুণ মূল্য ফেরৎ’ বা এই জাতীয় গ্যারান্টিমূলক প্রতিশ্রুতি অনেক সময়েই বিপণন কৌশলের অংশ হিসাবে অবলম্বন করা হয়ে থাকে। এই নির্দেশনার ফলে বিজ্ঞাপনে এই ধরণের চমক রাখা যাবে না। তা’তে গ্রাহক বিক্রেতার অঙ্গীকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

বিক্রেতার জন্য ডেলিভারীর সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও ক্রেতা যদি কোন কারণে ডেলিভারী নিতে অস্বীকৃতি জানান বা ডেলিভারী পয়েন্ট থেকে পণ্য গ্রহণ না করেন, সেক্ষেত্রে ক্রেতার কী দায় থাকবে, এ বিষয়ে কোন আলোকপাত করা হয়নি। এক্ষেত্রে বিস্তারিত নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। ক্যাশব্যাক অফার বা মূল্য-ছাড় অফারের ঘোষিত অর্থ ঐ ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানের ওয়ালেটে জমা রাখা যাবে না। যদিও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে ঐ মূল্যমানের কূপন বা ভাউচার ইস্যু করা যাবে কিনা, তা’ স্পষ্ট নয়। তা’ছাড়া, ওয়ালেট খোলার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক থেকে ঐ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন থাকলে সেখানেও এই টাকা জমা রাখতে পারা উচিৎ।

বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক কর্তৃক ঘোষিত ডিজিটাল কমার্সের পেমেন্ট নিষ্পত্তি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের সাথে এই ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকার সমন্বয় থাকা অত্যন্ত জরুরী। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পণ্য ডেলিভারীর সময় ৭ দিনের অধিক হলে তা’ এস্‌ক্রো-র অনুরূপ সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। কিন্তু যেহেতু পরিচালনা নির্দেশিকায় ১০ দিন পর্যন্ত ডেলিভারীর সময়সীমা রাখা হয়েছে, সেহেতু এ বিষয়ে সমন্বয়সাধন করার প্রয়োজন রয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে দুই ধরণের রীতি মেনে চলাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো সাবস্ট্যানটিভ, যেমন শালীনতা, বৈধতা এবং সত্যবাদিতা বজায় রাখা; শিশু-কিশোরদের কাছে বিপণন না করা; শর্তাবলীতে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম-অধিকার রাখা; দায় বর্জন না করা ইত্যাদি বিষয়ে মনযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয়। একই সাথে পণ্যসামগ্রীর গুণমান নিশ্চিত করা এবং তা’ নিরাপদ কিনা, তা’ দেখার দায়িত্বও বিক্রেতার নেওয়া উচিৎ।

দ্বিতীয়টি হলো প্রোসিডিউরাল, যেমন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ক্রেতাকে অর্ডার বাতিল করার ক্ষমতা প্রদান করা; কোন পণ্য বা পরিষেবায় বিশেষ ছাড় থাকলে তা’র সময়সীমা উল্লেখ করা এবং সময়ের আগেই পণ্য শেষ হয়ে গেলে ‘রেইন-চেক’-এর ব্যবস্থা রাখা যাতে ক্রেতা স্টক আসার পরও বিজ্ঞাপনে থাকা ছাড়ে ক্রয় করতে পারে; ঘোষিত মূল্যের অধিক কোনভাবেই দাবী না করা, এমনকি যদি ঘোষিত মূল্যটি ভুলবশতঃও হয়ে থাকে ইত্যাদি।

ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ে প্রতিযোগিতা বাড়ানো ও সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কিছু নিরপেক্ষ রিভিউ সাইট থাকা প্রয়োজন, যেখানে ভোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা লেখা থাকবে। এই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে বিক্রেতাকে রেটিং করা হবে। এতে গ্রাহকের ক্রয়ের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।

সর্বোপরী মনে রাখতে হবে, সকল নীতিমালা ও নির্দেশিকা ভোক্তা অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৈরী করা হয়ে থাকলেও তা’ যদি ব্যবসা-বান্ধব না হয়, তা’হলে এই খাতের উন্নতি সম্ভব হবে না। আইনের মাধ্যমে যেমন গ্রাহকের সুবিধা রক্ষা করা জরুরী, একইভাবে উদ্যোক্তার লাভও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত শৃঙ্খলাবদ্ধতা ব্যবসায়ের পরিবেশ, কৌশল, পরিচালনা ও সৃজনশীল বিপণনকে বাধাগ্রস্থ করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইন ও বিধানের উপযুক্ত বাস্তবায়ন। ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা ২০২০ (সংশোধিত) ও ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১-এর সুফল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার মধ্যে সমন্বয় রেখে এর সঠিক প্রয়োগ করলেই অপার সম্ভাবনাময় এই ডিজিটাল কমার্স খাতে আস্থা তৈরী হবে এবং উদ্যোক্তাগণ এই খাতে বিনিয়োগ করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন।

ডিজিটাল কমার্স,সৈয়দ আলমাস কবীর
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়